প্রায় ১৭ বছর ধরে তাঁর মুখ দেখা গিয়েছে ঢাকা ও বাংলাদেশের নানা প্রান্তে বিএনপির পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াললিখনে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়নি, উপস্থিতি ছিল অনুপস্থিত। সেই দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটাতে চলেছেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবার স্বেচ্ছা নির্বাসনের ইতি টেনে ঢাকায় ফিরেছেন। প্রায় দুই দশক পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির নয়, সহিংসতায় জর্জরিত বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ সপরিবার বাংলাদেশে হামলার শঙ্কা নিয়ে পা রাখলেন তারেক
বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনের ঠিক আগেই তারেক রহমানের দেশে ফেরা রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। এক সময় তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতির “ডার্ক প্রিন্স” বলে আখ্যা দেওয়া হতো। দুর্নীতি ও সহিংস রাজনীতির অভিযোগে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু এত বছর পর, যখন বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে, তখন তাঁর প্রত্যাবর্তন দলকে নতুন করে চাঙ্গা করতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় রাজনৈতিক মাঠ কার্যত ফাঁকা হয়ে এসেছে। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির মুখ হিসেবে তারেক রহমানের ফিরে আসা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের কাছে বড় আশার আলো। সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। তবে সেই সাফল্যের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে জামায়াত-ই-ইসলামি।
জামায়াত-ই-ইসলামি একসময় বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র ছিল। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দলটি নিষিদ্ধ হলেও গত বছর তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর আবারও ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের অপ্রত্যাশিত সাফল্য অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে।
আরও পড়ুনঃ নতুন সঙ্কট বাংলাদেশে! ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ইউনূসের পাশের চেয়ারগুলি
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির কাছে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আওয়ামি লিগ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই দল নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই ভারতের জন্য “মিশ্র বার্তা” হিসেবে দেখছেন। একদিকে, শক্তিশালী একটি জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে চরমপন্থী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। অন্যদিকে, জামায়াতের বাড়বাড়ন্ত এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ দিল্লির জন্য চিন্তার কারণ।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনুসের আমলে বাংলাদেশে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন জায়গায় ভারত-বিরোধী স্লোগান ও বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান কী অবস্থান নেন, তিনি কি জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবেন, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে সমঝোতার পথে হাঁটবেন—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে নয়াদিল্লি।









