সকালের কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই চায়ের দোকানে ভেসে আসে পরিচিত ডাক, ‘দাদা, একটা চা।’ তার সঙ্গে কাচের বয়াম থেকে পাতলা তেলচিটে কাগজে মোড়া ছোট্ট কেক। বহু বাঙালির সকাল এ ভাবেই শুরু হয় আজও। নামটা আলাদা করে বলার দরকার নেই, বাপুজি কেক নিজেই নিজের স্টেটমেন্ট।
আরও পড়ুনঃ বাংলার লৌকিক পার্বণ তুষ-তুষলী, পৌষলক্ষ্মীর ব্রতকথা
বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে এই কেক কোনও নতুন অতিথি নয়। বরং স্মৃতির অ্যালবামে পাতার পর পাতা জুড়ে তার উপস্থিতি। স্কুলের টিফিন বক্স খুললেই যে কেকটি দিব্যি জায়গা করে নিত, আজও অনেকের মনে সেই দৃশ্য অমলিন।

বড়দিন এলেই শহরের জানলায় জানলায় ঝুলে পড়ে কেকের রঙিন বিজ্ঞাপন। চকোলেট, প্লাম, রাম-ভেজানো ফলের কেক— নামের বাহার, সাজের ছটা। কিন্তু এই বাহারি কেকের ভিড়েও একেবারে নিজের মতো করেই টিকে আছে কাগজে মোড়া, সাদামাটা বাপুজি কেক। বড়দিনের কেক যেখানে মরশুমি উৎসবের অতিথি, বাপুজি কেক সেখানে বাংলার চিরস্থায়ী বাসিন্দা।
বাপুজি কেকের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক শুধু স্বাদের নয়, স্মৃতির। স্কুল থেকে ফেরার পথে পকেটে গুঁজে রাখা নামমাত্র টাকার কেক, টিফিন বাক্সে লুকিয়ে থাকা নরম স্পঞ্জের টুকরো, এই সব ছোট ছোট মুহূর্তেই গড়ে উঠেছে তার গৌরব। দাম কম, মোড়ক সাদামাটা, কিন্তু স্বাদে কোনও কার্পণ্য নেই। মাখনের গন্ধে ভরা নরম কেকের কামড়ে যেন ফিরে আসে ছেলেবেলা।
বড়দিনের কেকের সঙ্গে বাপুজি কেকের তুলনা চলে না, কারণ দু’টির চরিত্র আলাদা। বড়দিনের কেক উৎসবের জন্য, ছবি তোলার জন্য, টেবিল সাজানোর জন্য। আর বাপুজি কেক? সে নিত্যদিনের সঙ্গী। চায়ের কাপে ডুবিয়ে, বাসের জানালার ধারে বসে, অফিসের কাজের ফাঁকে— যে কোনও সময়ে সে হাজির। তার কোনও নির্দিষ্ট মরশুম নেই। বর্ষা-শীত-গ্রীষ্ম, সব সময়েই সে সমান জনপ্রিয়। শহরের পুরনো বেকারি থেকে মফস্বলের ছোট দোকান, সবখানেই বাপুজি কেকের দাপট।
আরও পড়ুনঃ ভারত-বাংলাদেশ আদর্শিক বন্ধুত্বের পাশাপাশি কি কৌশলগত সম্পর্ক নিয়েও ভাবা উচিৎ ভারতের?
সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছে সংস্থা। কেকের পাশাপাশি বাজারে এনেছে নানা ধরনের বিস্কুট ও পাউরুটি। তবু বাপুজি কেকই রয়ে গেছে তাদের পরিচয়ের মূল মুখ।

আজকের দিনে রঙিন প্যাকেটের ভিড়ে বাপুজি কেকের সেই সাদামাটা কাগজের মোড়ক হয়তো চোখে পড়ে না। কিন্তু এই সাধারণ মোড়কই পরিবেশবান্ধব। প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে যখন গোটা দেশ সচেতন হচ্ছে, তখন বহু আগেই এই সংস্থা কাগজের মোড়ক ব্যবহার করে পরিবেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আসলে বাপুজি কেক শুধু খাবার নয়, এক ধরনের আবেগ। সে মনে করিয়ে দেয় এমন এক সময়ের কথা, যখন আনন্দের জন্য বড়সড় আয়োজনের দরকার হত না। একটা কেক, একটু চা— এইতেই সুখ সম্পূর্ণ। বড়দিন আসবে, যাবে। বাহারি কেকের দোকান বদলাবে, ট্রেন্ড পাল্টাবে। কিন্তু কাগজে মোড়া বাপুজি কেক? চিরকালীন সত্য।









