বীরভূমের মাটির নীচে লুকিয়ে ছিল ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। পরপর পাঁচটি স্তর—প্রতিটি স্তরের কাঠামো ভিন্ন, কখনও গোলাকৃতি, কখনও ত্রিকোণ। স্তর যত উপরের দিকে উঠেছে, ততই আকারে ছোট হয়েছে নির্মাণ। আর সেই স্তরের পাশেই মিলেছে নানা আকৃতির পোড়ামাটির ধুনুচি।
আরও পড়ুনঃ আর কোনও ছাড় নয়, ভারতে আসলেই ‘টাইট’! বাংলাদেশকে মক্ষম জবাব শিলিগুড়ির
বীরভূমের মুরারই ব্লকের ভাদীশ্বর গ্রামে খনন করে প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন একটি মন্দিরের কাঠামোর সন্ধান পেল
ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা কেন্দ্রীয় আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (এএসআই) কলকাতা সার্কেল। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে যা নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
এএসআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাদীশ্বর গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই একটি উঁচু ঢিবি নজরে ছিল। স্থানীয়দের ধারণা ছিল, ঢিবির নীচে লুকিয়ে থাকতে পারে কোনও প্রাচীন স্থাপত্য। সেই অনুমানের ভিত্তিতেই প্রায় এক বছর আগে সেখানে খননকার্য শুরু করে এএসআই।
উদ্দেশ্য ছিল, মাটির তলায় থাকা অতীতের চিহ্ন উদ্ধার করে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণ করা। সম্প্রতি খনন শেষ হতেই সামনে আসে এই ব্যতিক্রমী মন্দির কাঠামো, যা দেখে চমকে উঠেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরাও।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ‘অকথ্য অত্যাচারে’ ফুঁসে উঠলেন মুজিবকন্যা
খননে দেখা গিয়েছে, মন্দিরটির সবচেয়ে নীচের স্তরটি ছিল সম্পূর্ণ গোলাকৃতি। তার উপর দ্বিতীয় স্তরে তৈরি হয়েছিল ত্রিকোণাকৃতি কাঠামো। তৃতীয় স্তরে সেই ত্রিকোণ কাঠামোকে কেন্দ্র করে আবার একটি গোলাকৃতি নির্মাণ করা হয়। চতুর্থ স্তর ফের ত্রিকোণ এবং সবশেষে উপরের স্তরটি তুলনামূলক ছোট আকারের গোলাকৃতি রূপে গড়ে তোলা হয়েছিল। এই ধরনের স্তরবিন্যাস ও জ্যামিতিক বৈচিত্র্য বাংলার মন্দির স্থাপত্যে অত্যন্ত বিরল বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
মন্দিরের আশপাশ থেকে বিপুল পরিমাণ পোড়ামাটির নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে। তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য পোড়ামাটির ধুনুচি। উপরের অংশ কিছুটা ভাঙা হলেও নকশা ও গঠনে তা সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানে প্রচলিত ধুনুচির সঙ্গে এর মিল নেই। ধুনুচিগুলির ধরার হ্যান্ডেল সোজা এবং নীচের দিকে গোলাকৃতি রিং যুক্ত, যাতে স্থির ভাবে বসানো যায়। একই ধরনের নয়—বিভিন্ন আকার ও নকশার একাধিক ধুনুচি মিলেছে। পাশাপাশি পোড়ামাটির বাটি, গামলা, পুঁথি-সহ নানা ব্যবহার্য সামগ্রীও উদ্ধার হয়েছে।
এই খনন প্রসঙ্গে এএসআই কলকাতা সার্কেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডঃ রাজেন্দ্র যাদব সংবাদমাধ্যমকে জানান, খননকার্য সম্পূর্ণ হয়েছে এবং প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা যাচ্ছে, মন্দিরটি পাল যুগের শেষ পর্ব ও সেন যুগের শুরুর সময়কালে নির্মিত। অর্থাৎ, এর বয়স প্রায় এক হাজার বছর। খনন সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট ইতিমধ্যেই দিল্লিতে এএসআই-এর ডিরেক্টরের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের এই নতুন অধ্যায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে।









