spot_img
Thursday, 15 January, 2026
15 January
spot_img
HomeদেশJagannath Temple: শ্রীক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে মৃৎপাত্রে মহাপ্রসাদ রন্ধনের আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক...

Jagannath Temple: শ্রীক্ষেত্র পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে মৃৎপাত্রে মহাপ্রসাদ রন্ধনের আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক মাহাত্ম্য

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মাটির পাত্রে মহাপ্রসাদ রন্ধন কেবল একটি রীতি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

নীলাচল ধাম বা পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ কেবল একটি খাদ্যবস্তু নয়, এটি ভক্তদের কাছে পরমেশ্বরের আশীর্বাদের এক মূর্ত প্রতীক। এই মহাপ্রসাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর রন্ধন প্রণালী এবং রন্ধন কার্যে ব্যবহৃত মাটির পাত্র বা ‘কুড়ুয়া’। কেন আধুনিক যুগেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই দেবালয়ে ধাতব পাত্রের পরিবর্তে মাটির পাত্রে রান্না করা হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন, পৌরাণিক ঐতিহ্য এবং বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্য। জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘর বা ‘রোষঘর’ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এবং পবিত্র রান্নাঘর হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য অন্ন ভোগ প্রস্তুত করা হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূলে রয়েছে মাটির পাত্রের অমোঘ প্রভাব। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মাটির পাত্র হলো পঞ্চভূতের প্রতীক— ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম। মৃত্তিকা বা মাটি থেকে তৈরি এই পাত্র সরাসরি পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং সাত্ত্বিক আহারের পবিত্রতা রক্ষা করে। শাস্ত্রমতে, মাটির পাত্রে রান্না করা খাদ্য শরীরের জন্য অত্যন্ত হিতকর কারণ মাটির ক্ষারকীয় গুণ বা অ্যালকালাইন ধর্ম খাবারের অম্লভাব বা অ্যাসিডিটি প্রশমিত করতে সাহায্য করে। এই আধ্যাত্মিক ও শারীরিক শুদ্ধির ধারণাই শত শত বছর ধরে এই মন্দিরের রন্ধনশৈলীকে অপরিবর্তিত রেখেছে।

আরও পড়ুনঃ বাংলার লৌকিক পার্বণ তুষ-তুষলী, পৌষলক্ষ্মীর ব্রতকথা

পুরীর মন্দিরে মহাপ্রসাদ রান্নার এক অলৌকিক বৈশিষ্ট্য হলো আগুনের ওপর মাটির পাত্র সাজানোর পদ্ধতি। রোষঘরে এক একটি উনুনে বা ‘চুল্লি’তে সাতটি মাটির পাত্র বা কুড়ুয়া একের ওপর এক লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়। বিস্ময়কর বিষয় হলো, আগুনের শিখা সবার নিচের পাত্রে লাগলেও, সবার উপরের পাত্রের অন্ন সবার আগে সেদ্ধ হয় এবং ক্রমান্বয়ে নিচের পাত্রগুলোর রান্না সম্পন্ন হয়। এই অলৌকিক ঘটনাকে ভক্তরা মা লক্ষ্মীর কৃপা বলে মনে করেন। কারণ বিশ্বাস করা হয় যে, মন্দিরের রান্নাঘরে স্বয়ং মা লক্ষ্মী রন্ধন কার্যের তদারকি করেন। মাটির পাত্রগুলো ছিদ্রযুক্ত বা পোরস (Porous) প্রকৃতির হওয়ায় আগুনের তাপ এবং বাষ্প নিচ থেকে উপরে ওঠার সময় প্রতিটি স্তরে সুষমভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ধাতব পাত্র হলে তাপের তীব্রতায় নিচের খাবার পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, কিন্তু মাটির পাত্র তাপকে অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং সমানভাবে সঞ্চালন করে, যা খাদ্যের পুষ্টিগুণ অটুট রাখে। এই মহাপ্রসাদকে ‘নিৰ্মাল্য’ বলা হয় এবং মাটির পাত্রে রান্না হওয়ার কারণেই এর স্বাদ ও সুগন্ধ অনন্য হয়ে ওঠে। মাটির পাত্রে রান্নার ফলে খাদ্যের আর্দ্রতা বজায় থাকে, ফলে অন্ন দীর্ঘক্ষণ তাজা এবং সুস্বাদু থাকে।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, মাটির পাত্র মানুষের নশ্বর শরীরের প্রতীক। উপনিষদ এবং অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যে দেহকে ‘মৃন্ময় ভাণ্ড’ বা মাটির পাত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন একটি মাটির পাত্র ভেঙে গেলে আবার মাটিতেই মিশে যায়, মানুষের শরীরও পঞ্চভূতে বিলীন হয়। জগন্নাথ মন্দিরে এই মৃত্তিকা ব্যবহারের মাধ্যমে ভক্তদের প্রতিমুহূর্তে জীবনের অনিত্যতা এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের শিক্ষা দেওয়া হয়। মাটির পাত্রের আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর বিশুদ্ধতা। শাস্ত্রীয় নিয়মানুসারে, এই মন্দিরে একবার ব্যবহৃত মাটির পাত্র দ্বিতীয়বার ব্যবহারের কোনো অনুমতি নেই। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবার জন্য নতুন নতুন কুড়ুয়া আনা হয় এবং ব্যবহারের পর সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়। এর ফলে পরম স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন বজায় থাকে, যা ধাতব পাত্রের ক্ষেত্রে অনেক সময় সম্ভব হয় না। প্রতিটি পাত্র সম্পূর্ণ নতুন এবং অকলুষিত হওয়ায় ভগবানের নিবেদিত ভোগ অত্যন্ত পবিত্র থাকে। এই ব্যবস্থার ফলে স্থানীয় কুম্ভকার সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পান, যা এই প্রাচীন মন্দিরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

আরও পড়ুনঃ ইউনুসের বাংলাদেশে আরও এক হিন্দু ব্যক্তি খুন! ছড়াল চাঞ্চল্য

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাটির পাত্রে রান্নার সময় খাবারের খনিজ উপাদানগুলো বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং আয়রন প্রাকৃতিকভাবে যুক্ত হয়। ধাতব পাত্র বিশেষ করে অ্যালুমিনিয়াম বা পিতলের পাত্রে রান্নার সময় তাপের প্রভাবে ধাতব কণা খাদ্যে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা শরীরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। কিন্তু মাটির পাত্র পুরোপুরি নিরাপদ। পুরীর মহাপ্রসাদে যে ডাল এবং তরকারি রান্না করা হয়, তা মাটির পাত্রের ধীর রন্ধন প্রক্রিয়ার কারণে তার ভিটামিন ও এনজাইমগুলো হারায় না। এই কারণেই মহাপ্রসাদ গ্রহণের পর কারোর হজমের সমস্যা বা শারীরিক অসুস্থতা দেখা যায় না। রোষঘরে আগুনের উৎস হিসেবে কেবল কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা মাটির পাত্রের সঙ্গে মিলে এক অদ্ভুত সুবাস তৈরি করে। এই সামগ্রিক পরিবেশটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মার মেলবন্ধন ঘটে। মাটির পাত্রের ভেতরের সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো দিয়ে বাতাস চলাচল করতে পারে, যাকে ‘ব্রিদিং স্পেস’ বলা হয়, যা খাবারকে সেদ্ধ হতে সাহায্য করে অথচ পুড়িয়ে দেয় না। এই প্রাচীন ভারতীয় প্রযুক্তি আজ আধুনিক বিশ্বের পুষ্টিবিদদের কাছেও প্রশংসার দাবি রাখে।

পরিশেষে বলা যায়, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মাটির পাত্রে মহাপ্রসাদ রন্ধন কেবল একটি রীতি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। মাটির স্পর্শে অন্ন যখন ‘প্রসাদ’ হয়ে ওঠে, তখন তাতে মাটির মমতা এবং পরমেশ্বরের আশীর্বাদ একাকার হয়ে যায়। এই মাটির পাত্রগুলো তৈরির জন্য যে বিশেষ ধরনের কাদা মাটি ব্যবহার করা হয়, তা মূলত স্থানীয় নদী ও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা হয়। কুম্ভকাররা অত্যন্ত শুদ্ধাচারে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে এই পাত্রগুলো তৈরি করেন। মন্দিরের নীলচক্রের ছায়ায় এই মৃন্ময় আধারেই লুকানো রয়েছে শ্রীক্ষেত্রের অমূল্য ঐশ্বর্য। আধুনিকতার জোয়ারে যখন প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম আমাদের গ্রাস করছে, তখন জগন্নাথের রোষঘর আমাদের শেখায় কীভাবে মাটির কাছাকাছি থেকে জীবনের প্রকৃত মাধুর্য আস্বাদন করা যায়। মহাপ্রসাদের প্রতিটি কণা এবং সেই মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ ভক্তদের কাছে অতি পবিত্র, যা চিরকাল শ্রীক্ষেত্রের মাহাত্ম্যকে অক্ষুণ্ণ রাখবে।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন