এমনই স্পষ্ট মন্তব্য করেন ভেনেজুয়েলায় ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ বিশ্বনাথন। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলার মানুষ অবশ্যই পরিবর্তন চান, কিন্তু সেই পরিবর্তন আসতে হবে দেশের ভেতর থেকেই— মার্কিন যুদ্ধবাজদের হাত ধরে নয়। বিশ্বনাথনের কথায়, এই হুমকি অনেকদিন ধরেই খাঁড়ার মতো ঝুলছিল। একবার যখন পরিস্থিতি তৈরি হল, তখন মাদুরোর হাতে ট্রাম্পকে আটকানোর মতো কোনও উপায়ই ছিল না। যদি এটা উত্তর কোরিয়া হতো, আমেরিকা এটা করত না। চিন বা রাশিয়া হলে তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তারা করেছে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে, লিবিয়ায় গদ্দাফির সঙ্গে এবং আফগানিস্তানে। কারণ এদের হাতে পরমাণু অস্ত্র ছিল না। আমেরিকার চোখে ভেনেজুয়েলা তাই ‘সহজ শিকার’— মারতে পারবে, কিন্তু পাল্টা কোনও বড় খেসারত দিতে হবে না।
আরও পড়ুনঃ ‘বেনজির’ প্রত্যাবর্তন! ঘাসফুল ছেড়ে হঠাৎ কংগ্রেসের হাত ধরলেন মৌসম; বড় অস্বস্তি তৃণমূলের
তিনি আরও বলেন, পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের দরকারও নেই। অর্থনৈতিক চাপে ভেনেজুয়েলাকে হাঁটু মুড়ে ফেলা সম্ভব। তেল রফতানি বন্ধ, বন্দর অবরুদ্ধ, আকাশপথে উড়ান নিষিদ্ধ— এই সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ইতিমধ্যেই দুর্বিষহ। আর কী দরকার? মানুষ আরও কষ্ট পাবে, ভুগবে। বিশ্বনাথনের অভিযোগ, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিকে নিয়ে আমেরিকার কোনও প্রকৃত সহানুভূতি নেই। ঠান্ডাযুদ্ধের সময় থেকেই তারা সরকার উৎখাত করেছে, আক্রমণ চালিয়েছে, স্বৈরতন্ত্রকে মদত দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। তাঁর কথায়, ওরা যা খুশি করবে, আর পার পেয়ে যাবে। থামানোর কেউ নেই।
যদিও ব্রাজিল, মেক্সিকো ও কলম্বিয়া কিছুটা আপত্তির সুর তুলেছে, তবে মাদুরোর সমর্থনে তারা চূড়ান্ত অবস্থান নেবে না বলেই মনে করেন তিনি। কারণ, ট্রাম্প পাল্টা আঘাত করলে তাদেরই ক্ষতি হবে। তারা আমেরিকার উপর নির্ভরশীল— তাই একটা সীমার বাইরে যাবে না। বিশ্বনাথন মনে করিয়ে দেন, হুগো চাভেজের আমলে ভেনেজুয়েলা ইউনাসুর ও মারকোসুর-এর অংশ ছিল। তখন এ ধরনের হামলা হলে গোটা আঞ্চলিক জোট বিষয়টি নিয়ে সরব হতো। কিন্তু মাদুরো নিজের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে (দু’জনই বামপন্থী নেতা) দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। বিতর্কিত নির্বাচনের সমালোচনা করায় তাঁদের প্রকাশ্যে আক্রমণ করা ছিল মাদুরোর বড় ভুল। ফলে আজ তাঁর জন্য সহানুভূতির ভাঁড়ারও ফাঁকা।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভেনেজুয়েলা কোনও একনায়কতন্ত্র নয়, এটি একটি সমষ্টিগত স্বৈরতন্ত্র। মাদুরো শুধু সামনের মানুষ। তাঁর কোনও ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নেই, জনসমর্থনও নেই। তিনি চাভেজ নন। তাই তাঁকে সরালেই মাচাদো ক্ষমতায় আসবেন— এটা ভাবাও ভুল। কারণ, মাচাদো ক্ষমতায় এলে প্রথমেই শীর্ষ সেনাকর্তা, মন্ত্রী, তেল সংস্থার প্রধানদের ট্রাম্পের হাতে তুলে দেবেন। তাঁদের সবার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা ঝুলছে। ফলে বর্তমান ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে মার্কিনপন্থী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর মানেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুনঃ শ্রী চৈতন্য কি আদৌ সন্ন্যাসী ছিলেন?
বিশ্বনাথন প্রশ্ন তোলেন, সৌদি আরব বা চিনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তো ট্রাম্প দিব্য কাজ করেন। তাহলে এখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল কেন? তাঁর মতে, লুলা যখন বলেছিলেন নির্বাচন বিতর্কিত, তখন মাদুরোর উচিত ছিল সংযম দেখানো। কিন্তু তিনি উল্টে লুলা ও পেত্রোকে আক্রমণ করেন— যা ছিল অকাঙ্ক্ষিত ও দুর্বলতার পরিচয়। তেলের রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শেল বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক। ফলে তারা ভেনেজুয়েলা, ইরান বা রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে পারে। এই দেশগুলোর তেল বাজারে অবাধে এলে দাম কমে যেত— যা ট্রাম্প চান না। তিনি টেক্সাসের তেল-ধনকুবেরদের সাহায্য করছেন। ভেনেজুয়েলার তেলের দরকার তাঁর নেই। চিন ও ভারতের মতো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে— ট্রাম্পের তাতে কিছু যায় আসে না।
মাদুরো সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য আরও কঠোর। তিনি জনগণের দুঃখ-কষ্টে আগ্রহী নন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তিনি হারবেন। বিদেশি মুদ্রার অভাব, তেল রফতানি বন্ধ— সব মিলিয়ে মানুষের জীবন নরকদশায় পৌঁছেছে। দেশে পরিবর্তন দরকার, কিন্তু সেটা আমেরিকার যুদ্ধজাহাজে চড়ে আসাটা মানবে না দেশের জনতা।
লাতিন আমেরিকার ইতিহাস টেনে বিশ্বনাথন বলেন, ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, চিলির মতো দেশে মার্কিন মদতপুষ্ট সামরিক শাসন ভেঙেছে স্থানীয় লড়াই, রাজনৈতিক আন্দোলন ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে। কিন্তু, নোবেল জয়ী মারিয়া মাচাদো সেই পথ নিতে চান না। তিনি সরাসরি ‘আঙ্কল স্যাম’ আর সিআইএ-র কাছে ছুটছেন, যেন তারা ক্ষমতা হাতে তুলে দেয়।
উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী ও ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নরওয়ের অসলো সফরে গিয়ে গোপনে পুরস্কার গ্রহণ করেন। এক বছরেরও বেশি সময় আত্মগোপনে থাকার পর নৌকায় করে দেশ ছাড়েন তিনি। বর্তমানে তাঁর অবস্থান অজ্ঞাত। তবে তিনি জানিয়েছেন, শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় ফেরার ইচ্ছা রয়েছে এবং পালানোর সময় পাওয়া আঘাত থেকে সেরে উঠছেন। বিশ্বনাথনের মতে, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে দেশের ভেতরের শক্তির দ্বন্দ্বে— বাইরের হস্তক্ষেপ সেই সংকট আরও গভীর করবে, সমাধান নয়।









