শুভজিৎ মিত্র,শিলিগুড়িঃ
পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অংশের মতো উত্তরবঙ্গেও পৌষ পার্বণ বা মকর সংক্রান্তি অত্যন্ত জাঁকজমক এবং নিজস্ব আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সাথে পালিত হয়।আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে,উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে এই পৌষ পার্বণের প্রধান ধারাগুলি নিচে তুলে ধরা হলো।
নতুন শস্যের আনন্দ!
উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে,যেমন – কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং-এর সমতল,আলিপুরদুয়ার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ প্রভৃতি মূলত কৃষিনির্ভর।তাই,পৌষ সংক্রান্তি এখানে প্রধানত নতুন শস্য ঘরে তোলার উৎসব বা নবান্ন হিসেবে পালিত হয়।
আরও পড়ুনঃ বাংলার ঘরে ঘরে কীভাবে পালিত হয়ে আসছে? বারো পার্বণের অন্যতম জনপ্রিয় পৌষ পার্বণ
আঁউনী-বাউনী উৎসব!
নতুন ধানের চাল তৈরি হওয়ার পর,গৃহস্থের বাড়িতে লক্ষ্মী দেবীর বিশেষ আরাধনা করা হয়।এই উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের আঁউনী-বাঁউনী বা ধানের ছড়া সংরক্ষণ করা হয়।যা পরের বছর পর্যন্ত ঘরে রাখা শুভ বলে মনে করা হয়।এর অন্যতম অনন্য দিক হলো,এদিন উঠোনে এবং বাড়িতে চালের গুঁড়ো দিয়ে শুভ চিহ্নের আলপনা আঁকা হয়। যা,স্থানীয় মানুষদের কাছে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের প্রতীক।
পিঠে-পুলির ভিন্ন স্বাদ
উত্তরবঙ্গে পিঠে-পুলির মূল ধারণা এক হলেও,এখানকার খাদ্যে পার্শ্ববর্তী আসাম,নেপাল বা বিহারের সংস্কৃতিরও কিছু প্রভাব দেখা যায়।
* চিতই পিঠে,উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক নাম।এটি ভাপা পিঠের মতো,চালের গুঁড়ো ও নলেন গুড় বা খেজুর গুড়ের সাথে পরিবেশিত হয়।
* পাকান পিঠে,এটি এক ধরনের মিষ্টি মালপোয়া, যা তেলে ভেজে চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয়। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এটি খুব জনপ্রিয়।
* সরুচাকলি,চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি পাতলা রুটির মতো, যা মিষ্টি বা নোনতা—উভয়ভাবেই খাওয়া হয়।এছাড়াও,এইসময়ে আঞ্চলিক মিষ্টির মধ্যে,তিল-গুড়ের নাড়ু,যা,তিল ও গুড় বা চিনি দিয়ে তৈরি হয়।মুড়ির মোয়া এবং খইয়ের মোয়া এই সময়ে খুব প্রচলিত।
মকর সংক্রান্তির মেলা
উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এবং নদীর তীরে সংক্রান্তি উপলক্ষে ছোট-বড় মেলা বসে।এই মেলাগুলিতে লোকনৃত্য, গান এবং পিঠে-পুলি, মোয়া, জিলিপির মতো নানান স্থানীয় খাবার বিক্রি হয়।তিস্তার মতো প্রধান নদী এবং অন্যান্য স্থানীয় নদীতে পুণ্যার্থীরা স্নান করেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, এই দিনে নদীতে স্নান করলে পুণ্য লাভ হয়।
আরও পড়ুনঃ নৃশংস ও বিভীষিকাময়, কলতলায় লাশ ধুচ্ছে যুবক! দিনহাটার ‘নরখাদক’
টুসু পুজোর রীতি!
যদিও টুসু উৎসব প্রধানত দক্ষিণবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের একটি লৌকিক উৎসব।তবে, মালদহ ও অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকায় এর কিছু প্রভাব দেখা যায়। এই দিনে কুমারী মেয়েরা টুসু দেবীর পূজা করে।
সামাজিক রীতি
দক্ষিণবঙ্গের মতো উত্তরবঙ্গেও এই দিনটিকে পারিবারিক ও সামাজিক মিলনের দিন হিসেবে দেখা হয়।এই দিনে তিল ও গুড়ের নাড়ু বিতরণ করা হয়।শীতের কনকনে ঠান্ডায় উষ্ণতা যোগানো এবং সম্পর্কের মধ্যে গুড়ের মতো মিষ্টি সম্পর্ক বজায় রাখা।নতুন পিঠে-পুলি তৈরির পর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী বাড়িতে পাঠানো হয়। জামাইষষ্ঠীর মতো জামাইদের বাড়িতে পিঠে পাঠানোরও রেওয়াজ আছে।
মোটকথা,উত্তরবঙ্গে পৌষ পার্বণ হলো,কৃষির প্রাচুর্য, পিঠে-পুলির বৈচিত্র্যময় স্বাদ এবং সামাজিক বন্ধনের উষ্ণতা—এই তিনটি উপাদানের এক সুন্দর মিশ্রণ।









