রবীন্দ্রসঙ্গীত মানেই কেবল সুর নয়, ভাবের সাধনা। সেই সাধনার পথেই আজীবন হেঁটেছেন অর্ঘ্য সেন। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান যেন শুধু শোনা নয়, অনুভব করা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গানে খুঁজে পেয়েছে আশ্রয়, শান্তি আর আত্মিক স্পর্শ। রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে তাই অর্ঘ্য সেন শুধুই একজন শিল্পী নন, তিনি এক অনুভূতির নাম।
আরও পড়ুনঃ মর্মান্তিক, বীভৎস! চলন্ত ট্রেনের উপর ভেঙে পড়ল ক্রেন, থাইল্যান্ডে ভয়াবহ দুর্ঘটনা
১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের ফরিদপুরে মামার বাড়িতে জন্ম তাঁর। আদি বাড়ি খুলনার সেনহাটি গ্রামে। বাবা হেমেন্দ্রকুমার সেন কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক, মা বিন্দুদেবী সঙ্গীতপ্রেমী। মায়ের কাছ থেকেই সঙ্গীতের প্রথম আলো ছুঁয়ে যায় অর্ঘ্য সেনকে। ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে বেড়ে উঠলেও পড়াশোনাকে কখনও অবহেলা করেননি তিনি।
শৈশব কেটেছে ফরিদপুরেই। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা, তারপর জীবনের টানে কলকাতায় আসা। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ। এরপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। সঙ্গীতচর্চার পাশাপাশি দায়িত্বশীল কর্মজীবনও সমানতালে এগিয়েছে।
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অর্গানাইজেশন-এ দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। সেখান থেকেই অবসর নেন। দিনের শেষে, কর্মব্যস্ততার মাঝেও গান ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
ছাত্রজীবনেই তাঁর সঙ্গীতযাত্রার সূচনা। রেডিওতে পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গীতশিক্ষা শুনে অনুপ্রাণিত হন। পরে অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। তবে দেবব্রত বিশ্বাস (জর্জ)-এর সান্নিধ্যে এসে তাঁর গানের জগৎ এক নতুন দিশা পায়। শব্দের গভীরতা, ভাবের সূক্ষ্মতা আর উচ্চারণের শুদ্ধতায় রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তিনি নিজের কণ্ঠে এক অনন্য মর্যাদা দেন।
অর্ঘ্য সেনের গানে রবীন্দ্রনাথ যেন আরও অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন। ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ বা ‘আমার মাথা নত করে দাও’, এই গানগুলো আজও শ্রোতার হৃদয়ে নিঃশব্দে ঢেউ তোলে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর আজীবন সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৭ সালে তিনি পান সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার। পরবর্তীতে ‘টেগোর ফেলো’ সম্মানও তাঁর ঝুলিতে আসে। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল তাঁর রেখে যাওয়া গান, যা আজও মানুষকে ভাবায়, শান্ত করে।
গান থেমে যায় না। অর্ঘ্য সেনের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের কলম প্রাণ পেয়েছে বারে বারে। আজ নিঃশব্দে থামল তাঁরও কণ্ঠ। তবে থেকে যাবেন তিনি আজীবন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের অন্যতম প্রাণপুরুষ হয়ে।









