আমেরিকায় কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত নথি (Epstein files)প্রকাশের পর এবার তা ঢেউ তুলল ভারতীয় রাজনীতিতেও। শুক্রবার আমেরিকার বিচার বিভাগ ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অধীনে আরও বেশ কিছু নথি প্রকাশ করে। সেই বিপুল নথির ভাণ্ডার থেকেই সামনে এসেছে ২০১৭ সালের একটি ইমেল, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কংগ্রেসের অফিসিয়াল এক্সহ্যান্ডেলে এই ইমেল প্রকাশ করে এই দাবি করা হয়েছে। এই ইমেল প্রকাশ্যে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
আরও পড়ুনঃ ‘চিকেন নেক.. কারও বাবার জমি,’ উত্তরবঙ্গে শাহি হুঙ্কার
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৯ জুলাই এই ইমেলটি পাঠিয়েছিলেন জেফ্রি এপস্টিন। ইমেলটির প্রাপক ছিলেন ‘জেবর ওয়াই’ নামে এক ব্যক্তি, যিনি সম্ভবত এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ মহলের সদস্য। ওই ইমেলে এপস্টিন লেখেন, “ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদী পরামর্শ মেনে চলেছেন এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সুবিধার্থে ইজ়রায়েলে নাচ ও গান করেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁদের দেখা হয়েছিল। এটি কাজ করেছে!”
এই ইমেল ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্কের ঝড়। কারণ, ২০১৭ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথমবারের জন্য ইজ়রায়েল সফরে গিয়েছিলেন। সেটিই ছিল কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি ইজ়রায়েল সফর। তার ঠিক আগেই, জুন মাসের শেষদিকে তিনি আমেরিকা সফর করেছিলেন, যেখানে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
এই ঘটনাক্রমকে সামনে রেখেই কংগ্রেস গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। বিরোধী দলের দাবি, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গেও মোদীর কোনও যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে। কংগ্রেসের আরও অভিযোগ, এপস্টিনের ইমেলে যে ‘পরামর্শ’-এর কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ীই মোদীর ইজ়রায়েল সফরের কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমেলটির স্ক্রিনশট শেয়ার করে কংগ্রেস নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে।
তবে ভারত সরকার এই সমস্ত অভিযোগ ও জল্পনা একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছে। শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদীর ২০১৭ সালের ইজ়রায়েল সফর ছিল একটি ঐতিহাসিক এবং সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক সরকারি সফর। একজন দণ্ডিত অপরাধীর ব্যক্তিগত ইমেলে লেখা কথার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিদেশ মন্ত্রক এই ইমেলকে ‘trashy ruminations’ বা ‘একজন অপরাধীর আবোলতাবোল বকবকানি’ বলে চরম অবজ্ঞার সঙ্গে খারিজ করেছে।
এই বিতর্কে মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এপস্টিন ইমেলে ‘নাচ ও গান’ কথাটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেননি। বরং এটি কোনও কূটনৈতিক বোঝাপড়া বা রাজনৈতিক পদক্ষেপের রূপক হতে পারে। অন্যদিকে, অনেক বিশ্লেষকের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতা জাহির করতেই এপস্টিন প্রায়শই অতিরঞ্জিত বা মনগড়া কথা লিখতেন। এই ইমেলও তেমনই কোনও বিভ্রান্তিকর দাবি হতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, মানব পাচার ও শিশু নিগ্রহের মতো গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত জেফ্রি এপস্টিন ২০১৯ সালে জেলবন্দি অবস্থায় মারা যান। সরকারিভাবে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বর্তমানে তাঁর সংক্রান্ত লক্ষ লক্ষ নথি প্রকাশ্যে আসায় বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে এই ইমেল ভারতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।









