ভারত চীন সীমান্তে উত্তেজনার ইতিহাসে ডোকলাম একটি আলাদা অধ্যায়। ২০১৭ সালের সেই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার নেপথ্যের ঘটনা আজও কৌতূহলের বিষয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ডিজিএমও লেফটেন্যান্ট জেনারেল একে ভাট তুলে ধরলেন সেই সময়কার একাধিক অজানা তথ্য। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ডোকলামের জামফেরি রিজ এলাকায় চীনের ধাপে ধাপে আগ্রাসী কৌশলকে কার্যত আটকে দিয়েছিল ভারতীয় সেনার দৃঢ় অবস্থান।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভাটের দাবি, চীনের মূল লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাস্তব পরিস্থিতি বদলে ফেলা। আন্তর্জাতিক সামরিক কৌশলের ভাষায় যাকে বলা হয় সালামি স্লাইসিং। অর্থাৎ একবারে বড় সংঘাত নয়, বরং ছোট ছোট পদক্ষেপে অবস্থান শক্ত করা। এই কৌশল অনুযায়ী রাস্তা নির্মাণ, সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং নজরদারি পয়েন্ট তৈরি ছিল চীনের পরিকল্পনার অঙ্গ।
আরও পড়ুনঃ বিজেপির ইশতেহার তৈরিতে মহা চমক, ভোটের আগে মাস্টারস্ট্রোক!
ডোকলাম মালভূমি ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভুটান, ভারত ও চীনের ত্রিসীমান্ত সংযোগস্থলের খুব কাছেই এই অঞ্চল। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করা সরু সিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা এই এলাকার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ফলে চীনের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগকে কেবল সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং কৌশলগত হুমকি হিসেবেই দেখেছিল নয়াদিল্লি।
প্রাক্তন সেনা আধিকারিক জানান, প্রথম দিকে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত টানটান। চীনা বুলডোজার ও নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে এগোতে শুরু করলে ভারতীয় সেনাও সমান্তরালভাবে নিজেদের যন্ত্রপাতি ও জনবল মোতায়েন করে। এক প্রকার মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। কোনও গুলি চালানো হয়নি, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল হিসেব কষে নেওয়া। সেনার ভাষায় এটিকে বলা যায় নীরব শক্তি প্রদর্শন।
প্রায় বাহাত্তর দিন ধরে চলা এই অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চললেও মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সেনার ধৈর্য ও সংযমই পরিস্থিতিকে বড় সংঘাতে গড়াতে দেয়নি বলে মত বিশেষজ্ঞদের। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভাট বলেন, সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। কোনও রকম উসকানিতে পা না দিয়ে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রেখার পরিবর্তন রুখে দেওয়া।
তাঁর কথায় উঠে এসেছে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সীমান্তে শক্ত অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। শুধু শারীরিক উপস্থিতি নয়, মানসিক দৃঢ়তাও সমানভাবে জরুরি ছিল। প্রতিটি সৈনিক জানতেন, তাঁদের এক একটি পদক্ষেপ কেবল একটি পাহাড়ি রিজ নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
আরও পড়ুনঃ ‘নইলে তোর অবস্থা আরজি কর করে দেব…’; খাস কলকাতায় তরুণীকে তৃণমূল নেতার প্রস্তাব…
ডোকলাম পর্বের পর ভারত চীন সম্পর্কের সমীকরণে স্পষ্ট পরিবর্তন আসে। সীমান্তে অবকাঠামো উন্নয়ন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং কৌশলগত প্রস্তুতির উপর জোর বাড়ায় ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাই পরবর্তী বছরগুলিতে ভারতের সীমান্ত নীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল একে ভাটের সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই কেবল অতীত স্মৃতিচারণ নয়, বরং বর্তমান ভূরাজনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সীমান্তে শক্ত অবস্থান এবং কূটনৈতিক সংযম একসঙ্গে চলতে পারে, ডোকলাম তারই বাস্তব উদাহরণ। ভারতীয় সেনার সেই নীরব কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি আজও কৌশলগত মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।









