লালমোহনবাবু বেঁচে থাকলে হয়তো ওপরের শব্দ দুটোই বলতেন। সকাল থেকে প্রতীক–উরকে নিয়ে যে নাটকীয় টানাপোড়েন চলছে, বিধানসভায় শূন্য হলেও ভোটপূর্ব বাংলায় অন্তত একদিনের জন্য বামেদের টিআরপি তুঙ্গে।
কিন্তু হায়, এতো পজিটিভ টিআরপি নয়। ঘটনা যাই ঘটে থাকুক, দিনের শেষে অস্বস্তিতিতে সিপিএম–ই। প্রতীক–উর–রহমান বামেদের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতিই তৈরি করে দিয়েছেন বটে।
আরও পড়ুনঃ ফোনে সিবিআই, ঘরে সিমবক্স! কলকাতা পুলিশের পর্দাফাঁস বিশাল টেলি জালিয়াতি চক্রের
প্রতীক–উর ঋতব্রতর মতো কোনও কেচ্ছায় জর্জরিত চরিত্র নন। গত নির্বাচনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে দাগ তো দূর, আঁচড়টুকুও কাটতে পারেননি। তবু প্রতীক–উর গুরুত্বপূর্ণ। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ভোটের হাওয়ায় গরম হতে এ বঙ্গে যখনই শুরু হয়েছে, তখন রাজ্যের শাসকদল হোক কিংবা বিরোধীদল নিয়ে গোটা দিনে কেউ একটি বাক্যও খরচ করার সুযোগ পায়নি।
কেন প্রতীক–উর এতটা গুরুত্বপূর্ণ?
১) যে তরুণ ব্রিগেডকে সামনে রেখে বাম সমর্থকরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছেন (যাঁর মধ্যে মীনাক্ষী, সৃজন, সায়নদীপ, শতরূপ, কলতানরা পড়েন) প্রতীক–উর তাঁদের মধ্যে অন্যতম। গত ভোটের আগে যখন এবিপি আনন্দের সাংবাদিক প্রতীক–উরকে প্রশ্ন করছে, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে আপনার লড়াই, ভয় করছে না?’, তখন প্রতীক–উরের সেই সপাট উত্তর যেন স্টেডিয়ামের বাইরে মারা ছক্কার মতোই অভিঘাত দেয়— ‘ভয়? দরকার পড়লে ক্যামেরাটা জুম করে আমার চোখ দুটো আর একবার দেখে নিন। এখানে ভয় বলে কিছু দেখতে পাবেন না।’
মাটির গন্ধওয়ালা কোনও ‘বেখৌফ’ বাম নেতার এমন সপাট মন্তব্য বেশ কয়েক বছরের মধ্যে শোনা যায়নি।
২) এই প্রতীক–উর ডায়মন্ডহারবারের ছাত্র আন্দোলনের ফসল। অভিযোগ, তৃণমূলের লোকজন নাকি তাঁকে একবার মেরে প্রায় আধমরা করে ফেলে দিয়েছিল। প্রতীক–উর আর বেঁচে নেই ভেবে চলে যায় তারা। প্রতীক–উর সেখান থেকে ফিরে এসে সেই বাম রাজনীতিটাই করছেন। আর করছেন কোথায়? না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক ডায়মন্ডহারবার এলাকায় দাঁড়িয়েই। এবং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও কোনও ক্যামেরা জুম করেও তাঁর চোখে ভয়ের লেশমাত্র খুঁজে পায় না।
এহেন প্রতীক–উর যদি দল ছাড়েন বা ছাড়তে চান, তাহলে ক্ষতি কার?
নিঃসন্দেহে দলের।
ক্ষতি আরও বেশি হবে, যদি প্রতীক–উর তৃণমূলে যোগ দেন। আগের বাক্যটা লেখার পরে আবার পড়লাম। এমনটাও কি হতে পারে? প্রতীক–উর–রহমানের মতো পার্টিনিবেদিত নেতা তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন? এটা মানা সম্ভব?
কিন্তু সন্দেহ জাগাচ্ছেন শ্রী সুমন চট্টোপাধ্যায়। এই ভদ্রলোক যতই এখনও কোনও হাউজে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত না থাকুন, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, এঁর ভবিষ্যদ্বাণী কখনও মিথ্যে হয় না। যে নিপুণ হোমওয়ার্ক তিনি ক্যামেরার সামনে আসার আগে করে থাকেন, তা কিছু সময়ের জন্য খুবই কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। স্পেকুলেশন স্টোরির ক্ষেত্রে ভদ্রলোকের ভবিষ্যদ্বাণী নস্ট্রাডামুসের মতোই নিখুঁত। অন্তত ট্র্যাক রেকর্ড সে কথাই বলছে।
ফলে, প্রতীক–উর কি তৃণমূলে যোগ দেবেন, এই প্রশ্নের উত্তরে একদিকে প্রতীক–উরের বিগত কর্মকাণ্ডের নিরিখে একটা আশা জাগছে, অন্যদিকে জাগছে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ভবিষ্যাদ্বাণীর আশঙ্কা। এই দু’য়ের দোলাচলের মধ্যে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণী, প্রতীক–উর–রহমান নাকি ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার আগেই তৃণমূলে যোগ দেবেন।
আরও পড়ুনঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন না কি নজরুল ইসলাম খান! বাংলাদেশের চর্চায় নতুন রাষ্ট্রপতি
তরুণ বাম সমর্থকের বেশির ভাগই ‘আনঅ্যাপোলজেটিকাল’। দলের যে কোনও বিতর্কিত মন্তব্য কাজ কাজকেই, ‘যা করেছি, বেশ করেছি’–র ফুৎকারে তাঁরা উড়িয়ে দেন। প্রতীক–উর ইস্যুতে দেখলাম, তাঁরা ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়’ নীতিটিকে ঘেমো রুমালের মতোই পকেটে পুরে দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন। বরং সোচ্চারে প্রতীক–উরের সমর্থনে গলা ফাটাচ্ছেন। প্রতীক–উরকে সমর্থন করা মানে, যাঁর বিরুদ্ধে প্রতীক–উরের ক্ষোভ, সেই মহম্মদ সেলিমের (অন্তত জল্পনা এই নামটাই তুলে আনছে) বিরোধিতা করা।
ফলে এবারের নির্বাচনে বামেদের যে অন্তত একটি থেকে দু’টি সিট জেতার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল, প্রতীক–উর বিতর্কে সেটি ক্রমশ ছড়িয়ে ছত্রখান হয়ে পড়ছে। কারণ, যিনি যাই বলুন, এত বছর পরে রাজনীতি করার পরে যদি মহম্মদ সেলিমকে ‘মন বোঝার জন্য’–ও হুমায়ুন কবীরের মতো এক ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক নেতার সাক্ষাৎ করতে হয়, তাহলে দলের সমর্থকদের শৃঙ্খলার প্রাচীরে চিড় ধরেই। আর প্রতীক–উরের মতো সৎ উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় নেতা যদি কোনও অসন্তোষ নিয়ে সরে যান তাহলে সেই চিড় হাঁ–মুখো ফাটলে পরিণত হতে সময় নেবে না।
একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি প্রতীক–উরের একটি চমৎকার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। বোকাবোকা একগাদা প্রশ্নের ভিড়ের মধ্যে এই সাক্ষাৎকারটি বেশ ভিন্নধর্মী। প্রতীক–উর সেখানে একটা আরও চমৎকার উত্তর দিয়েছেন, ‘আমার নাম প্রতীক–উর–রহমান বলেই প্রশ্ন উঠছে আইএসএফ কিংবা মিমে যোগ দেবো কি না? আর প্রতীক ভট্টাচার্য হলে প্রশ্ন উঠত বিজেপি–তে যোগ দেবো কি না?’ তার একটু পরেই থেমে বলেছেন, ‘যদি কোনওদিন অন্য দলে যেতে হয়, যেদিন হবে, সেদিনই বলব। তার আগে বলব কেন?’
প্রতীক–উর–রহমানের দলীয় আনুগত্য কারও কাছে প্রমাণ কার দরকার নেই। আজ, পদত্যাগ করে দেওয়ার পরেও গোটা দিন ধরে শত উস্কানিতেও তাঁর মুখ থেকে কোনও সাংবাদিক একটিও দলবিরোধী কথা বের করতে পারেনি। বরং শতরূপসহ একাধিক সিপিএম নেতার সম্পর্কে তিনি সৌহার্দ্যমূলক মন্তব্যই করে গেছেন। পাশাপাশি শতরূপ ঘোষের মতো নেতা প্রতীক–উরের পদত্যাগের পরেও বলছেন, প্রতীক–উর আমাদের দলের সম্পদ।
তার পরেও যদি তিনি দল পাল্টান, তাহলে বুঝতে হবে, যতটা না তিনি সিপিআইএম থেকে সরে গেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তাঁকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
প্রতীক–উরের দলবদল আর শুভেন্দু অধিকারী দলবদলকে এ বঙ্গের রাজনীতি এক নিক্তিতে মাপবে না কোনওদিনও।









