সুদিন চট্টোপাধ্যায়
‘কল্লোল বারবার দেখার সুযোগ হয়নি। মাত্র দু’বার দেখেছি। তার মধ্যে একবার মাথায় ইঁট পড়তে পড়তে পড়েনি, বেঁচে গেছি।
‘কল্লোল’, উৎপল দত্তের প্রতিবাদ। অহিংস পথে দেশে স্বাধীনতা আনার অনুচিত কংগ্ৰেসি আস্ফালনের বিরুদ্ধে উৎপলের ইতিহাসনির্ভর শৈল্পিক প্রতিবাদ। ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, (আজ সেই ঐতিহাসিক দিন) , মুম্বাই উপকূলে রয়্যাল ইণ্ডিয়ান নেভির নাবিকরা প্রথমে সাধারণ ধর্মঘট এবং অনতিপরেই বিদ্রোহ ঘোষনা করেছিলেন। বোম্বাই-এর উপকূলে শুরু হয়ে পুরো ব্রিটিশ ভারতে তা ছড়িয়ে পড়ে। করাচি ও কলকাতা বন্দরও বিদ্রোহীদের কবলে চলে যায়। মোট ৭৮টি জাহাজ, ২০টি তীরবর্তী প্রতিষ্ঠান এবং ২০,০০০ নৌবাহিনীর নাবিক ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যুক্ত হয়ে দেশের স্বাধীনতার সংগ্ৰামকে সশস্ত্র বাহিনীর অন্দরমহল পর্যন্ত পৌঁছে দেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনে সর্বাত্মক সমর্থন জানায়, আর কংগ্ৰেস এই আন্দোলন স্তব্ধ করতে ব্রিটিশ দমন নীতিকেই করে সমর্থন। ইতিহাসের জ্বলন্ত সত্য এইটুকু।
আরও পড়ুনঃ দেশীয় প্রযুক্তি AI ব্যবহারে শত্রু-দমন ভারতীয় সেনার; চিনের চক্রান্ত ধরে ফেলেছিল এআই
১৯৪৬-এ স্বাধীনতার আন্দোলনে নৌ বিদ্রোহের অবদানকে নস্যাৎ করেছে যে কংগ্ৰেস, তার বিশ্বাসঘাতকতার আবরণ ছিঁড়েখুঁড়ে সত্য উদ্ঘাটনের আন্তরিক প্রয়াস উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ নাটক। ‘শিল্পীর নবজন্ম’-এ রম্যাঁ রল্যাঁ বলেছিলেন , যেখানে অন্ধকার, সেখানে আলো ফোটানোর দায় শিল্পের, সত্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার শিল্পীর দায়িত্ব। ‘কল্লোল’ নাটকে সৎ শিল্পের দায় ও শিল্পীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ইতিহাসের পাতা থেকে মঞ্চের পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে এসেছেন দুরন্ত সেই ক’টি দিনের ঝটিকা প্রবাহ এবং নৌ সেনাদের বীরত্ব ও কংগ্ৰেসি বিশ্বাসঘাতকতার অকথিত কাহিনি।
এতো জোরালো ছিল তাঁর উপস্থাপনা এবং এতো ধারালো ছিল অভিনয়ের কন্ঠস্বর যে নগ্ন হয়ে যাওয়া মানুষগুলো হিংস্র হায়নার মতো নাট্য সাধনার দেউলকে আঁচড়ে কামড়ে রক্তাক্ত করতে কুন্ঠা বোধ করেনি। শিল্পের স্বাধীনতা হরণে সরকারি পোষকতায় দুর্বৃত্তের সহিংস আক্রমণ বাংলা দেখেছে গভীর বেদনা ও বিরক্তিতে । এসবের মধ্যেও ‘মিনার্ভা’ নাট্যশালা দর্শকে পরিপূর্ণ থেকেছে দিনের পর দিন।
১৯৬৫ সালের ২৮ মার্চ মিনার্ভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় উৎপল দত্ত রচিত, পরিচালিত ও অভিনীত নাটক ‘কল্লোল’৷ এই নাটকের উৎস ছিল শাহদাৎ আলির লেখা ‘নৌ-বিদ্রোহ’ বইটি, যে বইটি ব্রিটিশ সরকার অনেক আগেই নিষিদ্ধ করে । শোনা যায়, লালবাজারের কড়া নজর এড়িয়ে পুলিশের হেফাজত থেকে গোপন পথে তা উৎপল দত্তের হাতে পৌঁছয় । উৎপল দত্ত নাটকটি লিখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘ কল্লোল নাটক স্বাধীনতা সংগ্রামে নাবিক ও মজদুরদের শুধু বীরত্বের কথাই বলেনি, বলেছিল কংগ্রেসি বেইমানদের দেশদ্রোহিতার কথা৷’’ এছাড়াও, কমিউনিস্টরা জোরদার সমর্থনে দাঁড়িয়েছিল বিদ্রোহী সেনাদের পাশে। যেকথা কংগ্ৰেসিরা দুন্দভি বাজিয়ে প্রচার করেছে এতদিন যে স্বাধীনতা সংগ্ৰামে কমিউনিস্টদের কোনো ভূমিকাই ছিল না, তারও মূলোচ্ছেদ করেছেন নাট্যকার। নাটক মঞ্চস্থ হতে না হতেই সংবাদপত্রের নৈরাশ্যজনক ও পক্ষপাতপূর্ণ ভূমিকা প্রকট হয়ে পড়ে। তারা নাটকের অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আলোক সম্পাত, প্রয়োগ নৈপুণ্য ও নির্দেশনার কথা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে উহ্য রেখে নাটকের ঐতিহাসিকতা নিয়ে কপট বিতর্কে বাংলাকে বিভ্রান্ত ও বিরুদ্ধপথে চালিত করার সব রকম চেষ্টা করেছে। সংবাদপত্রগুলো নাটকের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত ছাপতে চায়নি। এসব দেখে সংবাদ মাধ্যমের কাছে একযোগে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন, সত্যজিৎ রায়, মধু বসু ,মন্মথ রায় সহ একদল শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী ৷ সাধারণ পাঠকেরাও আপত্তির কথা জানিয় চিঠি লিখেছেন, কাগজ সে সব ছাপেনি। এতো সব কাণ্ডের পরও,দর্শকদের ভালোবাসার উচ্ছ্বাস চাপা থাকেনি, প্রশস্তির কলরব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলায়। বিজ্ঞাপনের দরকার হয়নি, মিনার্ভায় উপচে পড়েছে ভিড়, টিকিট না পেয়ে দিনের পর দিন হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে হাজারো মানুষকে।
আরও পড়ুনঃ ভয়াবহ বিস্ফোরণ! ঝলসে গেল ৪ শিশু
নাটকের জয়োল্লাসে উদভ্রান্ত , উত্তেজিত , বিরক্ত সরকার শিল্পের, শিল্পীর স্বাধীনতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে উৎপল দত্তকে গ্ৰেপ্তার করে ৭ মাসের মতো জেলে পুরে রাখে । সুস্থ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নির্লজ্জ যুদ্ধ ঘোষণা । উত্তাল, উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বাংলার জনমত। বাংলার নাট্যপ্রেমী, সংস্কৃতি-প্রিয় মানুষজন, সুশীল সমাজ, বিদ্বজ্জন ও বুদ্ধিজীবীরা চুপ করে থাকেননি। সরব, সোচ্চার হয়েছেন। পত্রপত্রিকায় বিবৃতি ও বক্তৃতায় তাঁদের কন্ঠস্বর শোনা গেছে। কঠোর সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে, সে দেশগুলোর খ্যাতিমান নাট্য বিশারদেরা নিন্দায় মুখর হয়েছেন।
সত্যজিৎ রায়, মধু বসু ,মন্মথ রায়কে সামনে রেখে এবং তাঁদের অনুপ্রাণিত নেতৃত্বে ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ উৎপল দত্তের মু্ক্তির দাবিতে আর ‘কল্লোল’-এর মুক্ত ও বাঁধাহীন অভিনয়ের পক্ষে রাজপথে এক মহামিছিল বেরিয়েছিল৷ সরকার আগাম ঘোষণা করে দেয় , যে কোনো মূল্যে মিছিল আঁটকানো হবে, এমনকি দরকার হলে গুলিও চলবে। কিন্তু মিছিলের একেবারে সামনে বিশ্ববন্দিত সত্যজিৎ রায়কে হাঁটতে দেখে পুলিশ বন্দুক গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। জয় হয় জনতার, মনোবল ভাঙে সরকারের। মুক্তি পান উৎপল দত্ত।
একটি নাটকের কী প্রবল শক্তি, কী দুর্ভেদ্য আবেদন, কী জোরালো আওয়াজ, কী বিপুল জন সমর্থন ! প্রতিবন্ধকতার সমস্ত আয়োজন নিষ্ফল করে দিয়ে তা জাগিয়ে রাখে গোটা রাজ্যের বিবেককে। ৭মে ময়দানে বামপন্থীরা ‘কল্লোল বিজয় উৎসব’-এর সভা ডাকে৷ সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ জোয়ারের জলস্রোতের মতো সভায় ভেঙে পড়েছিল। খাইবার জাহাজের ডেকের আদলে তৈরি সভামঞ্চ থেকে জনতার সামনে সুস্থ সংস্কৃতি, সৎ নাটক এবং সাহসী প্রতিরোধ ও সংগ্ৰমের জয় ঘোষণা হয়। প্রমাণিত হয় কলকাতা মুক্ত চিন্তার মহানগরী, স্বচ্ছ বিবেকের বাসভূমি। জানিনা, শহর কলকাতা আজও এই সুনাম টিকিয়ে রাখতে পেরেছে কিনা ?









