সোমবার সকালে দলের সমস্ত পদ ছাড়ার কথা সামনে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াতে থাকে একটি চিঠি। প্রতীক উর রহমানের চিঠি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদককে লেখা। মানসিকতা মিলছে না, কাজে অসুবিধা হচ্ছে-এমন অনেক অভিযোগ জানানো হয় তাতে। আর সেদিন থেকেই তোলপাড় বিভিন্ন মাধ্যম। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বামেদের লড়াকু নেতা প্রতীক উর মুখ খোলেন সংবাদ মাধ্যমে। ক্ষোভ উগরে দেন দলের বিরুদ্ধে। এত পর্যন্ত ঠিকই ছিল। স্বাভাবিক মান-অভিমানের গল্পই মনে হচ্ছিল পুরো বিষয়টাকে।
কিন্তু তারপরই এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রথমে বাঁক নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। সামনে কোন দলের পথ খোলা, সে কথা না বললেও এক প্রশ্নের উত্তরে হঠাৎই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সরকারের প্রশংসা করতে শোনা যায় তাঁকে। যে প্রকল্প থেকে মানসিকতা, কাজ থেকে রাজনীতি করার ধরন নিয়ে এতদিন সমস্যা ছিল প্রতীক উরের, সেই প্রকল্পই তাঁর এখন দারুণ লাগছে। বলা চলে, তার প্রশংসা করলেন সদর্পে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে ভিক্ষা বলতে নারাজ এই যুব নেতার দাবি, তাঁরাও ভাতা বাড়ানোর কথা বলেছেন এককালে। সেই ভাতাকে কীভাবে ভিক্ষা বলা যায়!
সেই কলেজ জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে ছিলেন প্রতীক। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে জনসভা থেকে ছাত্ররাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই সরব মুখ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করার দায়ও ছিল তাঁর কাঁধে। একাধিক বার মার খেয়েছেন, উঠে দাঁড়িয়েছেন, একদম তৃণমূল স্তর থেকে কমিউনিস্ট পার্টি করে রাজ্য কমিটিতে উঠেছেন। সামলেছে আরও নানা দায়িত্ব। যে আদর্শ তাঁকে রাজনীতি শিখিয়েছে, সেই আদর্শ আজকাল আর দলে কারও মধ্যে তেমন দেখতে পান না বলে জানান এদিন। যে দল তিনি করেছেন এতদিন, সেখানেই দমবন্ধ লাগতে শুরু করেছে।
তৃণমূলে যাবেন কি না এপ্রশ্নের সরাসরি কোনও উত্তর না দিলেও একেবারে ঝেড়ে ফেলেননি তিনি। তবে, তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ খারিজ করেছেন এবং পাল্টা প্রশ্নে জানতে চেয়েছেন, “বিধায়ক-সাংসদের সঙ্গে কথা বললেই সেটিং? হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে মিটিং করার সময় আছে, আর আমার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই নেতৃত্বের!”
আরও পড়ুনঃ শুরু হচ্ছে রোদের রাজত্ব, ফেব্রুয়ারির শেষেই উত্তরবঙ্গে গরমের প্রকোপ
প্রতীকের অভিযোগ, সিপিএম ধীরে ধীরে মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। অভিযোগ করেন, দলের ভিতরে প্রশ্ন তোলাতেই তাঁকে ব্রাত্য করা হয়েছে। “রাজ্য সম্মেলন হচ্ছে, অথচ আমাকে ডেলিগেট করা হয়নি। প্রশ্ন তুললেই কেউ কেউ দলের ঊর্ধ্বে উঠে যান”। সিপিএমের নতুন নেতৃত্ব নাকি সমালোচনা শুনতে চান না। “সূর্যকান্ত মিশ্র সমালোচনা নিতেন। এখন দল পরিচালনায় সেটা আর নেই।” এমনকি ‘বাংলা বাঁচাও’ যাত্রায় সৃজন ভট্টাচার্যের নাম না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ছবিটা বেশ পরিষ্কার। তাঁর শরীরী ভাষা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রশংসা—সবই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে সম্ভাব্য শিবিরবদলের। যদিও প্রতীক নিজে বলেছেন, “এতদিন প্রকাশ্যে সিপিএম করেছি। অন্য দলে গেলে এটাও প্রকাশ্যেই হবে, রাতের অন্ধকারে নয়।”
আপাতত ভোটের মুখে বামেদের প্রতীক উর-অস্বস্তি বেশ খানিকটা চাপে ফেলছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এমন যুব নেতা যদি সত্যিই তৃণমূল শিবিরে যোগ দেয়, তাহলে যে বার্তা ছড়িয়ে পড়বে তা বামেদের আরও খানিকটা ব্যাকফুটে নিয়ে যাবে তা বলা বাহুল্য।









