Sunday, 3 May, 2026
3 May
HomeকলকাতাWB Election: গোলকধাঁধা, দিল্লির দাদাগিরি নাকি দিদির দুর্গ? বাংলার মসনদ কার?

WB Election: গোলকধাঁধা, দিল্লির দাদাগিরি নাকি দিদির দুর্গ? বাংলার মসনদ কার?

বিজেপি এককভাবে এখনও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মননে তার অধিকার স্থাপন করতে পারেনি। গায়ের জোরে ভালবাসা পাওয়া যায় না।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

৪-মে ভোটের ফল ঘোষণা হবে। যেন মনে হচ্ছে, গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবাংলায় একটা যুদ্ধ হল। যে আবাসনে আমি থাকি, সেখানে নিজের ফ্ল্যাট থেকে বেরোচ্ছিই না। ব্যালকনি থেকে দেখতে পাচ্ছি প্রতিবেশীরা সকালবেলায় হাঁটছেন। ভয়ঙ্কর আলোচনা চলছে কে জিতবে আর কে হারবে?

প্রত্যেকেই নির্বাচনী বিশ্লেষক। প্রত্যেকেই ভোট পণ্ডিত। আর আমি ভয়ে ভয়ে নিজের ফ্ল্যাটে আছি টেলিভিশনের পর্দায় নানারকমের এক্সিট পোল দেখছি। রাস্তায় বেরোলেই খপাত করে প্রতিবেশী ধরে বলছে, কী হচ্ছে বলুন? আমি বললাম, আমি নিজেই কনফিউজড। নিজেই বুঝতে পারছি না। এমনকি টিভি চ্যানেলের অ্যাঙ্কর পর্যন্ত বলছেন, সে কী? আপনি জানেন না! তা কী করে হয়? আপনি নিশ্চয়ই জানেন। আরে বাবা! আমি জানব কী করে? পোল স্টাররা হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি একজন পোল স্টার তো বলেছেন, কেউ কোনও কথা বলছেন না। আমি এবারে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এক্সিট পোল  অন্তত করব না। অন্যান্য রাজ্য নিয়ে এত সমস্যা নেই। সেগুলো নিয়ে এক্সিট পোল করে দিতে সকলেই প্রস্তুত।

পশ্চিমবঙ্গ‌ নিয়েই যত গেরো। আসলে কাণ্ডজ্ঞান দেখে মনে হচ্ছে, বিজেপি আক্রমণাত্মক। বিজেপি সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ সব অস্ত্র ব্যবহার করে এবার ভোটে কার্যসিদ্ধি করতে চেয়েছে। বেশ তো। সেটা একটা সক্রিয় রাজনৈতিক দলকে তো মানায়। সেটা করাটাই তো কাম্য। কিন্তু হিন্দিতে ‘জমিনে হকিকত’ বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ বাস্তবের মাটিতে কে কোথায় দাঁড়িয়ে আর কার কতটা সাংগঠনিক শক্তি সেটা তো বুঝতে হবে। মানুষকে তো ভোটটা দিতে হবে। এত নাম বাদ গেছে, এত লোক দলে দলে ভোট দিচ্ছে, তারপরেও কিন্তু বিজেপি হইহই করে ক্ষমতায় আসছে সেকথা এক্সিট পোলের কর্তারাও পর্যন্ত বলেছেন না।

এক্সিট পোলের কথা একটু দূরে সরিয়ে রাখি।

আরও পড়ুনঃ বঙ্গের ছোট দলগুলোর ‘তুরুপের তাস’ কি বদলে দেবে গদির দখল?

টিভি চ্যানেলেও আমি বলেছি, এক্সিট পোল হল, একধরনের সেরিব্রাল এন্টারটেইনমেন্ট। ভোটের ফলাফল বের হওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা জানতে পারি না যে, আসলে কে জিতছে আর কে হারছে?  দুটো দল তো একসঙ্গে জিততে পারে না। একদল জিতবে একদল হারবে। কিন্তু সেটা কে?

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় একদা একটা মজার কথা বলেছিলেন। সেটা অবশ্য রসিকতা ছিল। কিন্তু তার মধ্যেও একটা গূঢ় রাজনৈতিক বার্তা ছিল। তিনি বলেছিলেন, আসলে ভোটের ফলাফল সবথেকে ভাল প্রেডিক্ট কখন করা যায় জানিস? আমি বললাম, কখন? বললেন, ভোটের ফল বের হবার পর। ভোটের ফল বেরোনোর আগে পর্যন্ত সমস্ত আলোচনাই হচ্ছে ঘুড়ি উড়ানো। যাকে বলে ‘পলিটিক্যাল কাইট ফ্লায়িং’।

শুধু মনের মধ্যে কয়েকটা প্রশ্নচিহ্ন। আর সেগুলো সাহস করে বলে ফেলি। এই ওয়ালে অর্থাৎ সেই প্রাচীরে আমার সেই কথাগুলো লিপিবদ্ধ করছি।

প্রথমত, দ্বিতীয় দফার যে ভোট হল, সেটা তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ বলে পরিচিত। এটা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। বিজেপির নেতারাও সেকথা মানছেন। প্রথম দফায় বিজেপির যতটা আসন পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো অতীতের ফলাফল, তাদের সাংগঠনিক শক্তির প্রেক্ষিতে সেটা একরকম। আরেকটা হচ্ছে, দ্বিতীয় দফায়, তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তি অনেক বেশি। এখন এই দ্বিতীয় দফায় বিজেপি যতগুলো আসন পেয়েছিল সেই জায়গায় অন্তত আরও চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি আসন বিজেপিকে অতিরিক্ত পেতে হবে। তবে সরকার গড়ার দিকে বিজেপি যেতে পারে।

কিন্তু সেটা কী সম্ভব? বিজেপি শীর্ষ নেতারা জানতেন, সেটা কঠিন। আর সেজন্যই শেষ পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এতবেশি জোর লাগিয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দিভাষায় বক্তৃতা দিয়ে বাঙালির মন জয় করা সোজা কথা নয়। আমরা বাঙালিরা বলিউডের হিন্দি সিনেমা দেখি বটে। কিন্তু এখনও উত্তম-সুচিত্রা, ধর্মেন্দ্র-হেমা মালিনীর সিনেমার থেকে বেশি হিট। ব্যাপারটা বাঙালি-অবাঙালি নয়। ব্যাপারটা হল, দিল্লির মাতব্বরি। যদি বিজেপি এত ওভারডু না করত, তবে কী সেটা বিজেপির জন্য বেশি ভাল হত? এটা একটা প্রশ্ন।

যদি বিজেপি খুব ভাল ফল করে দ্বিতীয় দফায় এবং দেখা গেল যে প্রচণ্ড ঝড় আছে এবং সেই ঝড়ে খড়কুটোর মত তৃণমূল উড়ে গেল। তবে বলব, মোদী-অমিত শাহের কৌশল স্বার্থক।‌ আর যদি সেটা না হয়, যদি দেখা যায়, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই শেষ হাসি হাসছেন তাহলে বলতে হবে যে, এত উচ্চকিত প্রচার ‘দখল করব বাংলা’ সেই বোধহয় কৌশলগতভাবে ভুল।‌

আমার মনে দ্বিতীয় প্রশ্ন, মহিলা ভোট সত্যি কি ভেঙে গেছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক সে তো‌ আজকের নয়।আমার এখনও মনে আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী, তখন গৃহ সহায়িকাদের জন্য রেলের যে মান্থলি চালু করেছিলেন, কার্যত বিনামূল্যে বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ। এমনকি ব্যান্ডেল থেকে হাওড়া, দূরদূরান্ত মফস্বল শহর থেকে কাজ করতে আসা গৃহ সহায়িকাদের জন্য তিনি যা করেছিলেন, আজও তার সুফল তিনি পাচ্ছেন।‌

তখনও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হননি। কিন্তু মহিলা উপভোক্তা সেই গণদেবতার একটা বড় অংশ মমতার সঙ্গে যেভাবে যুক্ত হয়ে আছেন সেই ভোট তাঁকে বিদায় জানিয়ে বিজেপির কাছে চলে গেছে? শুধু সংসদের মহিলা সংরক্ষণ বিল আর নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তির প্রচারে?

তারপরের প্রশ্ন মুসলমান ভোট। এসআইআরে ঠিক কতজন মুসলমানের নাম বাদ গেছে তার জানিনা। এখন ভোটের পর টিভির পর্দায় অনেকে কান্নাকাটি করছেন বহু মুসলমান ভোটার ভোট দিতে গিয়ে দেখেছেন তারা মৃত। কেউ বলছেন, আমার নাম বাদ গেছে। একজন একশো বছরের বৃদ্ধ, তিনি শেষমুহূর্তে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করে তিনি ভোট দিতে এসেছেন। সেই বৃদ্ধ মুসলিম বলছিলেন, যেদিন থেকে ভোটার হয়েছি, সেই আঠারো বছর বয়স থেকে ভোট দিয়ে যাচ্ছি।‌ আর ভোট দেব না তাই কি হয়? তাই শত কষ্ট স্বীকার করেও শতায়ু ব্যক্তি এবার ভোট দিয়েছেন। সবমিলিয়ে এসআইআর ঠিক কার পক্ষে গেল সেটাও একটা মস্ত জিজ্ঞাসা চিহ্ন।

সুতরাং আপাতত প্রশ্ন তোলা ছাড়া উত্তর দেওয়ার মত পরিস্থিতি আমার নয়।‌

ভোট হয়ে গেছে।‌ এখন ইভিএম মেশিনগুলোকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।‌ স্ট্রং রুমের ভিতরে সাধারণ রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিষিদ্ধ। কেন্দ্রীয় বাহিনী পাহারা দিচ্ছে স্ট্রং রুম।‌ কিন্তু এরই মধ্যে নিঃশব্দে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত দলের জেলা নেতৃত্বদের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছেন যে ভোট হয়ে গেছে বলে কাজ শেষ হয়ে যায়নি। পাহারা দিতে হবে ইভিএম মেশিনকে। সংগঠন আছে বলেই প্রত্যেকটা জেলায় এখনও এইসব কর্মীরা নিরাপদ দূরত্বে থেকেও পাহারা দিচ্ছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আমাদের কোনও ভরসা নেই এই কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর।‌ তাঁরা ইভিএম মেশিন নিয়ে কী করছে, সেটা যতটা সম্ভব নজর রাখা উচিত। বিজেপির সংগঠন তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন থেকে এখনও যে দুর্বল, সেকথা স্বীকার করতেই হবে। তবে বিজেপি অনেকটাই নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশন আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর। তারা মনে করছে, আর যাইহোক তৃণমূল কংগ্রেস ভোটে কারচুপি করতে পারবে না। আর অ্যান্টি ইনকম্বেন্সির জন্য মানুষ তৃণমূল কংগ্রেস অর্থাৎ মমতার বিরুদ্ধে ভোট দেবে।

সত্যি কি তাই।

নির্বাচন কমিশন দেখলাম, পর্যবেক্ষকরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁরা তাঁদের কর্তব্য করুন। ভোট যারা দেওয়ার তাঁরা দিয়ে দিয়েছেন। এখন এই এসআইআরের ফলে কারা বাদ গেছেন, কতজন বাদ গেছেন তার এখনও সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। প্রথম দফায় যারা বাদ গেছিল, তাতে হিন্দু ভোটাররা বেশি বাদ গেছিল। পরবর্তীকালে যারা বাদ গেছে সেখানে নাকি মুসলমান ভোটার বেশি বাদ গেছে। কিন্তু এদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশী, কতজন রোহিঙ্গা সেসব জানা যায়নি। নির্বাচন কমিশন বলেছে যে, সেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ব্যাপার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বলছে সেটা নির্বাচন কমিশন জানাবে। হয়তো জানাবে পরে। যখন ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হয়ে যাবে।

যারা ভোটার হতে পারেনি অথচ অবৈধ নয়, ভোটার হিসেবে তাদের জমা দেওয়া  ফর্ম নিয়ে বিতর্ক ছিল।‌ তাকে বলা হয়েছিল ‘সাবজুগেটেড’।‌ সেই তালিকাভুক্ত বহু মানুষ ভোট যে দিতে পারে নি তারা নির্ধারক ভোটার নয়। তারা নির্ধারক শক্তি নয়। কিন্তু তাদের পরিবার, তাদের আশপাশের মানুষজন খুব তিতিবিরক্ত হয়ে আছে। এই তিতিবিরক্ত হয়ে থাকা যে ভোট সেই ভোটগুলো কার বিরুদ্ধে যাবে? আর কার পক্ষে যাবে?

আরও পড়ুনঃ সকালে বহুতলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড; ন’জনের ঝলসে মৃত্যু

এর মধ্যে একটা বড় অংশের মানুষ, তারা বলছে, আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের কাজে অসন্তুষ্ট। কিন্তু আর যাইহোক বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ঠুকতে দেওয়া যাবে না। আর বিজেপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া মানে গোটা দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে চলবে।‌ আর যাইহোক সেটা বাঙালির সরকার হবে না।‌

আমাদের পাড়ার নকুলমামা এখন ভোট হয়ে যাওয়ার পরে মুখ খুলেছেন। তিনি চায়ের আসরে বলছেন, আসলে একটা আঞ্চলিক দল যদি বিজেপির থাকত, আর তাদের সমর্থন জানিয়ে একটা বাঙালির দলকে সামনে নিয়ে আসা সম্ভব হত, তাহলে হয়তো পশ্চিমবঙ্গে একটা কিছু হতে পারত। কিন্তু বিজেপি এককভাবে এখনও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মননে তার অধিকার স্থাপন করতে পারেনি। গায়ের জোরে ভালবাসা পাওয়া যায় না।

সংবাদ মাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া দিল্লি থেকে নিয়ে আসা নেতাদের দিয়ে কার্পেট বোম্বিং এসবই এবার চোখে পড়ার মত ছিল। বিজেপির অর্থবল, বাহুবল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা। অনুপ্রবেশের মত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে হিন্দু ভোটকে সুসংহত করার চেষ্টা নিজেদের দলের ঝুলিতে ফেলার উদ্দেশ্যে।‌ এইসবই ঠিক।

কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হবে বিজেপির? শুধুই প্রশ্ন। উত্তর নেই। প্রশ্ন তুলছি। উত্তর আপনারা দেবেন।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন