বিশেষ নিবন্ধ ও সংবাদ পর্যালোচনা:
একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যে কোনো সরকারের বা রাজনৈতিক দলের ‘হাতের পুতুল’ নয়—তা ভারতের কোটি কোটি ভোটারের সামনে কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন দেশের ১০ম প্রধান নির্বাচন কমিশনার টি. এন. শেষণ। ৯০-এর দশকে দায়িত্ব নেওয়ার পর সংবিধান বর্ণিত পথকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে তিনি প্রশাসনিক অনিয়ম ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে ইমপিচমেন্ট আনার তোড়জোড় বিরোধী শিবিরের
টি. এন. শেষণের ঐতিহাসিক নির্বাচনী সংস্কারসমূহ
দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনী ব্যবস্থার গলদ দূর করতে এবং সাধারণ ভোটারের অধিকার সুরক্ষিত করতে তিনি একগুচ্ছ কঠোর ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন:
| সংস্কারের ক্ষেত্র | টি. এন. শেষণ গৃহীত ঐতিহাসিক পদক্ষেপ |
| ভোটারদের পরিচয়পত্র | দেশজুড়ে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র (Voter ID Card) চালু বাধ্যতামূলক করেন। |
| আচরণবিধি ও খরচ | প্রার্থীদের নির্বাচনী খরচের উর্ধ্বসীমা নির্ধারণ এবং ভোট পেতে টাকা, মদ বা কোনো উপহার দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। |
| সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার | শাসক দল কর্তৃক সরকারি তহবিল, যানবাহন বা প্রশাসনিক পরিকাঠামো প্রচারের কাজে ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করেন। |
| ধর্ম ও শব্দদূষণ রোধ | প্রচারে জাতি-পাত বা ধর্মীয় উসকানিমূলক স্লোগান নিষিদ্ধকরণ এবং প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া মাইক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। |
আরও পড়ুনঃ ফের ভোটের বাদ্যি! কালীপুজোর পর ফের ভোট বঙ্গে
বিহার ও পাঞ্জাবের নির্বাচন বাতিল এবং বহুমুখী কমিশন গঠন
নির্বাচনে জালিয়াতি ও অসদুপায় অবলম্বনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। বিহার ও পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও বুথ দখলের অভিযোগ ওঠার পর তিনি তদন্তের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করেছিলেন।
তাঁর এই নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থানের কারণে তদানীন্তন রাজনৈতিক দলগুলির কাছে তিনি চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও নির্বাচন কমিশনের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত দু’জন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেন। নিয়ম তৈরি হয়—প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে টি. এন. শেষণ থাকলেও, কোনো একক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না; তিন কমিশনারের সহমতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। এই ব্যবস্থাই আজও ভারতীয় নির্বাচন কমিশনে বহাল রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা
টি. এন. শেষণের দৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই একসময় ভারতের নির্বাচন কমিশন গোটা বিশ্বে স্বাধীন ও স্বচ্ছ ভোট পরিচালনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। বর্তমান সময়ে নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যখনই প্রশ্ন ওঠে, তখনই ভারতের কোটি কোটি নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা টি. এন. শেষণের নীতি, সংবিধানের প্রতি নিষ্ঠা এবং আপসহীন সংগ্রামের কথা স্মরণে আনেন।


