বিশেষ আইনি ও সুপ্রিম কোর্ট প্রতিনিধি:
বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে নির্বিচারে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে কিংবা অযোগ্য ঘোষণা করে ভোটাধিকার হরণের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান গ্রহণ করল আইনি মহল। এক তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জল ভূঁইয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, মূল প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অন্য ঘটনা বা ‘হোয়াটঅ্যাবাউটারি’ (Whataboutery)-র আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি নাগরিককে ভোটাধিকারহীন করে দেওয়ার প্রক্রিয়া অন্তর্নিহিতভাবেই স্বেচ্ছাচারী। এটি শুধু একটি প্রক্রিয়াগত ভুল নয়, বরং “সংবিধানের হৃদয়ে সরাসরি আঘাত।”
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি রক্ষায় সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সাংবিধানিক রূপরেখা ও গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন বিচারপতি।
আরও পড়ুনঃ তিলোত্তমার নতুন ‘বড়বাজার’; বিধান রায়ের স্বপ্নের সল্টলেকে লাগামছাড়া ব্যবসায়িক দাপট
‘হোয়াটঅ্যাবাউটারি’ ও ভোটাধিকার হরণের সাংবিধানিক ঝুঁকি
বিচারপতির মতে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার বিষয়টিকে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ যুক্তি বা প্রশাসনিক খেয়ালখুশি দিয়ে ন্যায্য প্রমান করা যায় না:
-
‘হোয়াটঅ্যাবাউটারি’-র অপব্যবহার: নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ভুলের জবাব না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ টেনে এনে নজর ঘোরানোর কৌশলকে আইনসম্মত বলা যায় না।
-
সাংবিধানিক ব্যবস্থার অস্বীকৃতি: কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া ভারতের সংবিধানের মৌলিক নীতির বিরোধী এবং এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দেয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৫ ও ৩২৬: সমতার আইনি ভিত্তি
ভোটাধিকার কেন নিছক কোনো প্রশাসনিক সুযোগ নয়, বরং সাংবিধানিক অধিকার, তা বোঝাতে সংবিধানের দুটি মূল অনুচ্ছেদ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে:
| সংবিধানের অনুচ্ছেদ | মূল বক্তব্য ও আইনি সুরক্ষা |
| অনুচ্ছেদ ৩২৫ (Article 325) | লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে একটাই সাধারণ ভোটার তালিকা থাকবে। শুধুমাত্র ধর্ম, বর্ণ, জাত বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া বা অযোগ্য ঘোষণা করা বেআইনি। |
| অনুচ্ছেদ ৩২৬ (Article 326) | লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের (১৮ বছর বা তার বেশি) ভিত্তিতে। মানসিক অসুস্থতা, গুরুতর অপরাধ বা নির্দিষ্ট আইনি অযোগ্যতা ছাড়া কোনো ভারতীয় নাগরিককে নির্বিচারে বাদ দেওয়া যাবে না। |
আরও পড়ুনঃ আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি, ককরোচদের ‘বেগন স্প্রে’ নিদান কৌস্তভের
ধনকুবের বনাম রিকশাচালক: সামাজিক সাম্য ও আম্বেদকরের দর্শন
ভোটের অধিকার যে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার, তা বোঝাতে বিচারকের বার্তা:
-
ভোটের সমান মূল্য: “একজন কোটিপতি ধনকুবের হতে পারেন, আর একজন সাধারণ রিকশাচালক হতে পারেন; কিংবা সমাজের উচ্চস্তরের পুরোহিত ও প্রান্তিক শ্রেণির মেথর—ভোটের বাক্সে সকলের ভোটের ওজন ও মূল্য ঠিক সমান।”
-
আম্বেদকরের দৃষ্টিভঙ্গি: বি আর আম্বেদকরের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, ভোটাধিকারের ভিত্তি সংবিধানেই নির্দিষ্ট করা রয়েছে। এটি কোনো সংসদীয় আইনের খেয়ালখুশি বা প্রশাসনিক রদবদলের ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়।
১৮৯৫ সালের ‘স্বরাজ বিল’ থেকে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার হরণ কেবল তালিকা সংশোধনের বিষয় নয়, বরং তা নাগরিকের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বের ওপর সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।


