Monday, 12 October, 2026
12 October
HomeকলকাতাDurga Puja: রাজা-জমিদারদের জাঁকজমক থেকে পাড়ার থিম; বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য পেরিয়ে দুর্গাপুজোর...

Durga Puja: রাজা-জমিদারদের জাঁকজমক থেকে পাড়ার থিম; বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য পেরিয়ে দুর্গাপুজোর সর্বজনীন হয়ে ওঠার রূপকথা

১৮ শতক ও ১৯ শতকের কলকাতায় অভিজাত হিন্দু পরিবারগুলির কাছে দুর্গাপুজো স্রেফ দেবীর আরাধনা ছিল না—তা ছিল নিজেদের অর্থবল, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রভাব জাহির করার অন্যতম সেরা মঞ্চ।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ প্রতিবেদক, কলকাতা:

আজকের দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই, থিমের মণ্ডপ আর লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল। কিন্তু এই মহাউৎসবে রূপ নেওয়ার আগে দুর্গাপুজোর ইতিহাসের এক বড় অংশ জুড়ে ছিল বনেদি বাড়ির অন্দরমহল, জমিদারদের প্রতিপত্তি এবং ব্রিটিশ শাসনাধিকারীদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের রাজনীতি। ১৮ শতক ও ১৯ শতকের কলকাতায় অভিজাত হিন্দু পরিবারগুলির কাছে দুর্গাপুজো স্রেফ দেবীর আরাধনা ছিল না—তা ছিল নিজেদের অর্থবল, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রভাব জাহির করার অন্যতম সেরা মঞ্চ।

ঠাকুরদালানের স্থাপত্য ও সামাজিক বিভাজন

তৎকালীন কলকাতার আভিজাত্য বুঝতে গেলে চোখ রাখতে হয় বনেদি বাড়িগুলির বিশেষ স্থাপত্যের দিকে। বিশাল ঠাকুরদালান, তার সামনে খোলা উঠোন আর চারপাশে স্তম্ভযুক্ত বারান্দায় বসত পুজোর আসর। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা অভিজাতদের পছন্দ অনুযায়ী দুর্গা প্রতিমা গড়ে তুলতেন। একদিকে চলত সনাতনী নিয়মে দেবী আরাধনা, অন্যদিকে বাড়ির অন্য অংশে চলত দেশি-বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়ন, নাচ-গান ও বিপুল ভোজের আয়োজন। বাড়ির পুরুষেরা উঠোনে অতিথিদের সঙ্গে মেলামেশা করলেও মহিলারা থাকতেন পর্দাঘেরা ব্যালকনি বা জানলার আড়ালে—যা তৎকালীন সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক কাঠামোরই স্পষ্ট প্রতিফলন।

আরও পড়ুনঃ  সমকামী আবহ নয়, তিলোত্তমার ঐতিহ্যই আসল! পুজোয় কলকাতার ফ্লাইওভারে রামধনু রঙ ও আলপনার ছোঁয়া নিয়ে সেজেছে শহর

শোভাবাজার রাজবাড়ি ও ক্লাইভ-কাহিনি

কলকাতার বনেদি পুজোর কথা উঠলেই প্রথমেই আসে শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নাম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাঁর ছিল সুগভীর প্রশাসনিক যোগাযোগ। প্রচলিত কাহিনি বলে, ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর নবকৃষ্ণ দেবের পুজোয় উপস্থিত ছিলেন খোদ লর্ড রবার্ট ক্লাইভসহ একাধিক ব্রিটিশ আধিকারিক। সন্ধিপুজোর সূচনায় কামান দাগার মতো রাজকীয় প্রথাও সেখানে চালু ছিল। যদিও এই কাহিনির নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত, তবুও নবকৃষ্ণ দেবের দেখাদেখি কলকাতার ধনকুবেরদের মধ্যে আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

জমিদার ও ব্যবসায়ীদের আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা

শোভাবাজারের পর বীডন স্ট্রিটের দেব পরিবার, হাটখোলার দত্ত পরিবার এবং অন্য ধনী ব্যবসায়ীরা পুজোকে আরও আকর্ষণীয় করতে প্রতিযোগিতায় নামে। প্রতিমাকে সোনার গয়না ও মূল্যবান রত্নে সাজানো, দূর-দূরান্ত থেকে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের উড়িয়ে আনা এবং রাজকীয় ভোজের আয়োজনে কেউ কাউকে ইঞ্চি ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। ধর্মীয় নিষ্ঠা থাকলেও এই বিপুল খরচের নেপথ্যে সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল।

ব্রিটিশ অতিথিদের আপ্যায়ন ও সাহেব কালচার

ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জমিদারি পরিচালনায় বাড়তি সুবিধা মিলত। তাই সাহেবদের আমন্ত্রণ জানানো হয়ে ওঠে পুজোর মূল আকর্ষণ। ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য আলাদা ঘরে থাকত বিদেশি মদ, খাসাপানের আয়োজন, পাশ্চাত্য সংগীত ও নাচের ব্যবস্থা। উত্তর ভারতের দরবারি সংস্কৃতির নামজাদা গায়িকা ও বাইজিদের (যেমন নিকি, উশুরান) পারফর্ম করার জন্য আনা হতো। আবার এই ইউরোপীয়দের একাংশই পরবর্তীতে নিজেদের লেখায় ভারতীয় পুজো ও নাচ-গানকে ‘অনভিজাত’ বলে কটাক্ষও করত।

আরও পড়ুনঃ মোদি সরকারে লুকিয়ে রাহুলের ২০০ চর! বিস্ফোরক দাবি বিরোধী দলনেতার

সামাজিক দায়িত্ব ও বৈরাগ্যের মেলবন্ধন

শুধু ভোগ-বিলাস নয়, এই পুজোকে ঘিরে চলত ব্যাপক দানধ্যান। ব্রাহ্মণভোজন, দরিদ্রদের জামাকাপড় ও অর্থ বিতরণ করার মাধ্যমে অভিজাতরা নিজেদের পুণ্য অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেন। তবে সব পরিবার যে আড়ম্বরে বিশ্বাসী ছিল তা নয়, কিছু পরিবার সম্পূর্ণ সংযম ও ধর্মীয় আচার মেনেও পুজো করত।

বনেদি উঠোন থেকে বারোয়ারি ও সর্বজনীন যাত্রা

১৯ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ শাসনের ধরন বদলাতে শুরু করে। কোম্পানির কর্তারা ধীরে ধীরে ভারতীয়দের পুজো বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন। পাশাপাশি, বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে পুজো চালানো অনেক জমিদার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ফলাফলস্বরূপ, পুজোর ভরকেন্দ্র বনেদি বাড়ির উঠোন থেকে বেরিয়ে রাজপথে নেমে আসে। শুরু হয় চাঁদা তুলে বারোয়ারি পুজোর সংস্কৃতি, যা কালক্রমে আজকের ‘সর্বজনীন’ রূপ নিয়েছে। গতকালের সেই রাজকীয় প্রদর্শনীই আজ বিবর্তিত হয়ে স্থান করে নিয়েছে মুক্ত আকাশের নিচে সর্বজনীন থিমের মণ্ডপে, যার শিকড়ে আজও রয়ে গেছে কলকাতার ইতিহাস, ক্ষমতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন