বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধি, কলকাতা:
‘রাজা বদলায়, চলন বদলায় না।’ জমানার পরিবর্তন হলেও সরকারি অনুষ্ঠান ও প্রচারের কাজে পছন্দের সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেনা সংস্কৃতি যেন অবিচল। ডেকরেটর, ক্যাটারার থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনী সংস্থা—প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঘুরেফিরে একই সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ট্র্যাডিশন নিয়ে ফের তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। তৃণমূল জমানায় ‘জেনেসিস অ্যাডভারটাইজিং’ (Genesis Advertising)-এর একচ্ছত্র অধিপত্য থেকে শুরু করে বর্তমান বিজেপি প্রশাসনের অধীনে আমেদাবাদের ‘গোবানানাস’ (GoBananas)-কে মেগা ইভেন্টের বিপুল কোটি টাকার বরাত প্রদান—স্বজনপোষণ ও ভাষা-বিভ্রাটের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।

আরও পড়ুনঃ একদিনেই কোটিপতি! রেকর্ড গড়ল কলকাতা মেট্রো
প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ‘স্বজনপোষণ’: জেনেসিস থেকে ভিনরাজ্যের রাজত্ব
তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে রাজ্যের যাবতীয় সরকারি বিজ্ঞাপন, অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যম, দেশ-বিদেশের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করত কলকাতার ‘জেনেসিস’ নামের একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা। শাসকদলের শীর্ষনেতৃত্ব ও আমলাদের মৌখিক নির্দেশে বহু বেসরকারি সংস্থাও নিজেদের এজেন্সি থাকা সত্ত্বেও জেনেসিসকে দিয়ে কাজ করাতে বাধ্য হত বলে অভিযোগ।

ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রচার ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসবে বলে আশা করা হলেও, উৎসবের মরশুমে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে:
-
কলকাতা পুরসভার ভাষা-বিভ্রাট: ‘মায়ের করব স্বচ্ছতা সে স্বাগত’—কলকাতা পুরসভার প্রকাশিত এই অদ্ভূত এআই-কৃত (AI) বাংলা বিজ্ঞাপন ঘিরে নেটদুনিয়ায় ঝোড়ো সমালোচনা শুরু হয়। ক্ষোভের মুখে বাক্য বদলে করা হয় ‘স্বচ্ছতার সাথে মাকে স্বাগত জানাই’।
-
এগারো হাতের দুর্গা বিতর্ক: অতীতে মিলনমেলা প্রাঙ্গণে সরকারি বিজ্ঞাপনী পোস্টারে মা দুর্গার এগারোটি হাত এঁকে চরম কটাক্ষের মুখে পড়েছিল প্রশাসন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রং দিয়ে অতিরিক্ত হাতটি মোছা হলেও ক্ষোভ থামেনি, যার জন্য পরবর্তীতে খোদ প্রশাসনিক প্রধানকেও ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।
ইডেন গার্ডেন্সে ‘উমা আগমনী’ ও ১৬৭ কোটি টাকার বহিরাগত বিতর্ক
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে আয়োজিত বিপুল জাঁকজমকপূর্ণ মেগা ইভেন্ট ‘উমা আগমনী’-কে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসার কথা থাকলেও শেষমেশ বিরোধী আন্দোলন ও রাজধানী রাজনীতির জটিলতায় শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উপস্থিত না থাকলেও ড্রোন শো ও বাজির রোশনাইয়ে ইভেন্ট আয়োজিত হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রবেশের জন্য কীভাবে পাস বিতরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে থেকে গেছে অস্বচ্ছতা।

তবে বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে এই ইভেন্টের খরচ ও আয়োজক সংস্থাকে কেন্দ্র করে:
-
১৬৭ কোটি টাকার মেগা বাজেট: প্রায় ১৫০ থেকে ১৬৭ কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল বরাত পেয়েছে আমেদাবাদের সংস্থায় নিবন্ধিত ‘গোবানানাস’ (GoBananas), যার কর্ণধার নিশিত শাহ।
-
সাব-এজেন্সিতেও ঠাঁই নেই বাংলার: গোবানানাস আবার যে তিনটি সাব-এজেন্সিকে বরাত ভাগ করে দিয়েছে, তার একটিও পশ্চিমবঙ্গের নয়।
-
স্বপন দাশগুপ্তের মন্তব্য: মঙ্গলবার কলকাতায় পার্টনারশিপ সামিটে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ক্ষোভ উসকে দিয়ে মন্তব্য করেন, “মহালয়ার মেগা ইভেন্ট করতে পশ্চিম ভারত থেকে লোক আনতে হলো। আশা করি এর থেকে কাজটা শিখে আগামী বছর বাংলার কোনো এজেন্সি পারবে।”
আরও পড়ুনঃ স্ট্যালিন-হিটলারের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা! ২০২৮-এর মধ্যেই জার্মানিতে রুশ হামলা?
তদন্ত ও স্বচ্ছতার দাবি
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্যক ধারণা না থাকা ভিনরাজ্যের এজেন্সিকে দিয়ে কীভাবে সরকারি কোষাগারের ১৬৭ কোটি টাকা তুলে দেওয়া হলো এবং এই বরাতের পেছনে কাদের কায়েমী স্বার্থ জড়িত রয়েছে, তা নিয়ে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে বিভিন্ন মহল। স্থানীয় সংস্থাকে বঞ্চিত করে এই ধরনের স্বজনপোষণের ধারা অবিলম্বে বন্ধ না হলে কাজের মান ও সংস্কৃতি—দুই-ই যে প্রশ্নের মুখে পড়বে, তা স্পষ্ট।


