উৎসবের আলোয় সেজেছিল কলকাতা। মা দুর্গার দর্শন করতে, পরিবারের সঙ্গে আনন্দের কয়েকটি মুহূর্ত কাটাতে, ছোট্ট শিশুর হাত ধরে মণ্ডপে এসেছিলেন কত মানুষ। কিন্তু সেই আনন্দের সন্ধ্যাই কারও জীবনে পরিণত হলো চরম দুঃস্বপ্নে। উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিল; এই রাজ্যে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কি এতটাই মূল্যহীন?

প্রবল বৃষ্টি, উপচে পড়া ভিড়, হুড়োহুড়ি এবং পদপিষ্ট হওয়ার আতঙ্কে মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল পরিস্থিতি। মণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে পড়ার খবরও সামনে এসেছে। বহু মানুষ আহত হয়েছেন। মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে একটি সাত বছরের শিশুর মৃত্যুর কথা জানা গেলেও একটি সংবাদ মাধ্যমে ১৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৩ মিনিটের প্রতিবেদনে ২০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে আসায় সরকারি নিশ্চিত বিবরণ জরুরি।
একবার ভাবুন, যে শিশুটি বাবা-মায়ের হাত ধরে দেবী দর্শনে এসেছিল, সে যদি আর বাড়ি ফিরতে না পারে, সেই পরিবারের কাছে দুর্গাপুজোর আনন্দ চিরকালের কান্নায় পরিণত হয়। যে মা সন্তানকে নিয়ে মণ্ডপে গিয়েছিলেন, তাঁকেই যদি হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে সন্তানের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেই যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। উৎসবের নামে এই অসহায়তা, এই আতঙ্ক, এই প্রাণহানির দায় কে নেবে?
পুজোর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ; জবাবদিহি কোথায়?

এই পুজোর উদ্বোধন করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জুলাই মাসে পুরোনো পুজো কমিটিকে ইস্তফা দিইয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া পুজো কমিটির চিফ প্যাট্রন হন শুভেন্দু অধিকারী-র ভাইপো দেবদীপ অধিকারী, পুজো কমিটির চেয়ারম্যান হন জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা। পুজো কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী হন উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ।

পুজোর উত্থান যাঁর হাত ধরে, সেই জয়ন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছের লোক। রাজ্যে পালাবদলের পরে পুজো থেকে বিদায় নিতে হয়েছে জয়ন্তকে। ‘এলাকাবাসীর দাবি মেনে’= ! পুজোর কর্তৃত্ব চলে এসেছে বিজেপি নেতাদের হাতে।

সেই তালিকা দীর্ঘ। মুখ্য উপদেষ্টা পদে উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ। শোনা যায়, তিনিই পুজোর প্রাণপুরুষ। চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন জোড়াসাঁকো বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝা। আর মুখ্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম রয়েছে দেবদীপ অধিকারীর, যিনি সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো।

বিপর্যয়ের আগে পুলিশ-প্রশাসন কোথায় ছিল?
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে অপেক্ষারত দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও ভিড়ের চাপ তৈরি হয় এবং অনেকে পড়ে যান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্গাপুজোর মতো বিপুল জনসমাগমের ক্ষেত্রে বৃষ্টির মতো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি কোথায় ছিল?
প্রবেশ ও বেরোনোর পথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল কি?
মণ্ডপের কাঠামো, উঁচু করিডোর এবং জরুরি নির্গমনপথ যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি?
প্রবল বৃষ্টিতে ভিড় জমে গেলে দর্শনার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল কি?
ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি?
বিপর্যয়ের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করতে পুলিশ ও প্রশাসন প্রস্তুত ছিল কি?
দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে পুলিশ ও দমকলের উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে এলাকার মানুষই সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের এই মানবিক ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই সহযোগিতা প্রশাসনের পূর্বপ্রস্তুতির বিকল্প হতে পারে না। বিপর্যয়ের পরে উদ্ধারকাজ জরুরি, কিন্তু বিপর্যয় এড়ানোর জন্য আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ আরও জরুরি।
রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, মানুষের জীবনের মূল্য বড়
বামেদের শারদীয়া বুক স্টলগুলিতে আরএসএস ও বিজেপি কর্মীরা যে ঝামেলা সৃষ্টি করছে, সেখানেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। কারণ পুলিশকে হয়তো বলা আছে, কোন ঝামেলার ঘটনা ঘটলে নিষ্ক্রিয় থাকতে। কারণ শারদীয়া বুক স্টলে স্টলে আরএসএস, বিজেপির কর্মীরা ঝামেলা করছে; সেখানে গিয়ে নাক গলাচ্ছেন না পুলিশ। স্বভাব বসত এখানেও নিষ্ক্রিয় থেকে গেছে। এবং আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পশ্চিমবঙ্গ সফরে পুলিশ আরো অত্যন্ত ব্যস্ত।

এখন আমরা জানতে চাই, নিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না কেন ? গাফিলতি যে হয়েছে তা প্রমাণিত, তার দায় কার? বিপুল জনসমাগমের অনুমতি দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই করা হয়নি কেন? রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কোনও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেন না থাকে তা প্রশাসনকে দেখতে হবে।
সর্বোপরি চোরবাগানের এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা আজ অত্যন্ত জরুরি।


