বিশেষ প্রতিবেদন:
পুজোর আনন্দ মুহূর্তেই গভীর বিষাদে পরিণত হওয়ার এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী থাকল রাজ্য। কলকাতার চোরবাগানের মণ্ডপে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ির জেরে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আগরপাড়ার তেরো বছরের কিশোর প্রাঞ্জল সরকার। উত্তর ২৪ পরগনার আগরপাড়ার তেঁতুলতলা এলাকার বাসিন্দা অনুকূল সরকারের ১৩ বছরের ছেলে প্রাঞ্জল একজন উদীয়মান সাঁতারু ছিল। ছেলের আবদার মেটাতেই পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও তাঁদের সন্তানদের নিয়ে চোরবাগানের পুজো দেখতে গিয়েছিলেন অনুকূলবাবু। কিন্তু সেই আনন্দ ভ্রমণ যে তাঁদের জীবনে এত বড় ট্র্যাজেডি ডেকে আনবে, তা ঘুণাক্ষরেও কেউ বুঝতে পারেননি। চোরবাগানের এই ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় নিহত ১৯ জনের তালিকায় নাম রয়েছে ছোট্ট প্রাঞ্জলেরও।
আরও পড়ুনঃ ফের দুর্ঘটনা শহরে, দশমীর সন্ধ্যায় ভয়াবহ ঘটনা; নিউ টাউনের ঝুলন্ত রেস্তোরাঁয় আগুনের ফুলকি
কীভাবে ঘটেছিল সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত?
পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার রাতে চোরবাগানের মণ্ডপে হঠাৎ করেই জনস্রোত ও ভিড় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মণ্ডপের ভেতর শুরু হয় প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কি। সেই সময়েই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ভিড়ের চাপে একে একে মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড়ের চাপে বাবা অনুকূল সরকারের হাত থেকে ছাড়া হয়ে যায় প্রাঞ্জল। চারপাশের সেই অবর্ণনীয় বিশৃঙ্খলা, বাঁচার আকুতি এবং বাইরে অঝোরে বৃষ্টির মধ্যে দিশাহারা হয়ে পড়েন বাবা।
অন্যের সন্তান বাঁচাতে গিয়ে নিজের ছেলেকে হারানো
ভিড়ের মধ্যে নিজের ছেলেকে খুঁজতে শুরু করলেও, চারপাশে অজস্র শিশুকে মাটিতে পড়ে ছটফট করতে দেখেন অনুকূলবাবু। নিজের সন্তানের জন্য চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থাকা সত্ত্বেও সেই অসহায় শিশুদের তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে তিনি একে একে সাত-আটটি শিশুকে সেই মারাত্মক ভিড় থেকে টেনে নিরাপদ দূরত্বে উদ্ধার করেন।

খোঁজাখুজির একপর্যায়ে তাঁর নজরে পড়ে প্রাঞ্জলেরই এক বান্ধবী আহানা মাটিতে পড়ে রয়েছে। কোনোমতে তাকে ভিড় থেকে টেনে বার করে রাস্তার ওপর শুইয়ে বুক চাপড়াতে শুরু করেন তিনি। জ্ঞানহীন আহানাকে একটানা কয়েক মিনিট সিপিআর (CPR) দেওয়ার পর তার জ্ঞান ফিরে আসে। সেই মুহূর্তে সামান্য স্বস্তি মিললেও প্রাঞ্জলকে না পাওয়ার যন্ত্রণা ফের তাঁকে গ্রাস করে। স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার কাছে আহানাকে সুরক্ষিত রেখে তিনি আবারও ছেলের খোঁজে ছুটে যান।
হাসপাতালে শেষ রক্ষা হয়নি
এদিকে মাইকে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ভুলের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও আতঙ্কজনক করে তোলে। দিশাহারা বাবা পুলিশকর্মীদের কাছে ছেলের বিবরণ দিয়ে বারবার খোঁজ নিতে থাকেন। অবশেষে এক মহিলা পুলিশকর্মীর কথা অনুযায়ী প্রবেশপথের বাইরের একটি ছোট মেডিকেল সহায়তা কেন্দ্রের কাছে গিয়ে থমকে যান অনুকূলবাবু। সেখানে শুইয়ে রাখা একটি শিশুকে চিনতে পারেন— সে আর কেউ নয়, তাঁর আদরের প্রাঞ্জল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে ছেলেকে বাঁচানোর আকুলতায় বাইক বা অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য হাতজোড় করে ভিক্ষা করতে শুরু করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত এক দয়ালু বাইকচালক এগিয়ে আসেন এবং প্রাঞ্জল ও তাঁর বাবাকে কলকাতার মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যান। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরেও নিজের হাতে ছেলেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে একটানা সিপিআর দিতে থাকেন বাবা। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরতরে না ফেরার দেশে চলে যায় তেরো বছরের প্রাঞ্জল। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অসহায় বাবা সেই শোকস্তব্ধ অবস্থাতেই ফোনে মৃত্যুর খবর জানান মা প্রিয়াঙ্কা দেবীকে।
আরও পড়ুনঃ ইন্দোনেশিয়ার বাংদুংয়ে চরম তাণ্ডব; বিক্ষোভকারীদের হামলায় পুলিশের গাড়িতে দাউদাউ করে জ্বলল আগুন
স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও পরিবারের কান্না
সন্তানহারা মা প্রিয়াঙ্কা দেবী একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আজ সম্পূর্ণ পাথর ও দিশাহারা। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে তিনি শুধু ছেলের ঘরের দিকে চেয়ে বসে রয়েছেন। আগামী রবিবারই তাঁদের সপরিবারে মেঘালয় ঘুরতে যাওয়ার সমস্ত পরিকল্পনা পাকা করা ছিল, যা নিয়ে দারুণ উত্তেজিত ছিল প্রাঞ্জল। কিন্তু সেই আনন্দ আজ মিলিয়ে গেছে বিষাদের অতল গহ্বরে। ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাঞ্জলের সাঁতার প্রতিযোগিতার নানা সাফল্যের স্মারক, মেডেল ও শংসাপত্র। যে ছেলেকে ঘিরে হাজারো স্বপ্ন বুনেছিল পরিবার, সেই ঘর আজ শুধুই শূন্যতায় ভরা।
শোকার্ত পরিবারের পাশে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব
এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে বুধবার প্রাঞ্জলের শোকার্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মণ্ডপের ভেতরের ভয়ঙ্কর ভিড়, অব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভ মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন সন্তানহারা পিতা। পাশাপাশি, স্থানীয় বিধায়ক রত্না দেবনাথও নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে যাতায়াত করছেন এবং শোকার্ত মা প্রিয়াঙ্কা দেবীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সন্তানের শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, তবুও এই গভীর সংকটে গোটা এলাকা শোকের ছায়ায় আচ্ছন্ন।


