বিশেষ প্রতিবেদন:
দূর থেকে সবুজ চাদরে মোড়া হিমালয়ের পাহাড়গুলিকে যতই শান্ত ও স্নিগ্ধ দেখাক না কেন, এর ভূগর্ভের গভীরে নীরবে ঘটে চলেছে সুদূরপ্রসারী ও বিপজ্জনক ভৌগোলিক পরিবর্তন। পরস্পরের দিকে ধেয়ে আসা ‘ইন্ডিয়ান প্লেট’ (Indian Plate) এবং ‘তিব্বত প্লেট’ (Tibetan Plate) একে অপরের সঙ্গে লাগাতার ধাক্কা খেয়ে চলেছে। কিন্তু এই সংঘর্ষের ফলে যে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে, তা এতদিন এক জায়গায় আটকে থেকে ভূগর্ভেই জমা হচ্ছিল। সম্প্রতি একটি নতুন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে জানানো হয়েছে যে, উত্তরাখণ্ডের ভূগর্ভের নিচে এই সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ এখন এতটাই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো মুহূর্তে একটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প ঘটানোর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
আরও পড়ুনঃ আর কিছুদিনের মধ্যেই তৈরি হতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’; তবে কি দুর্যোগের আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গেও!
গবেষণার নেপথ্যে কারা এবং কোন প্রযুক্তির ব্যবহার?
আমেরিকার নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি (IIT) এবং তামিলনাড়ু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গবেষণার কাজে তাঁরা মহাশূন্যে থাকা ‘গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম’ (GNSS) এবং জাপানের অত্যাধুনিক ‘ALOS-2’ র্যাডার স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত নিখুঁত ও উচ্চমানের উপগ্রহ চিত্র ও তথ্য ব্যবহার করেছেন।
১১৫ কিমি জুড়ে অবরুদ্ধ ‘মেইন হিমালয়ান থ্রাস্ট’ ফল্ট
উক্ত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাখণ্ডের ঠিক নিচে অবস্থিত ‘মেইন হিমালয়ান থ্রাস্ট’ (Main Himalayan Thrust) নামক বিশাল ফল্ট বা চ্যুতিটি প্রায় ১১৫ কিলোমিটার প্রস্থ জুড়ে বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে আটকে বা অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। ভূত্বকের নিচে থাকা এই দুটি পাত প্রতি বছর প্রায় ১৮ মিলিমিটার হারে একে অপরকে জোরালো ধাক্কা মারলেও ঘর্ষণের ফলে তারা সামনের দিকে এগোতে বা সরে যেতে পারছে না।
এর ফলে এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া চলছে— উচ্চ হিমালয় পর্বতমালা প্রতি বছর গড়ে ৪ থেকে ৬ মিলিমিটার করে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ভূগর্ভের ভেতরে এভাবে অবিরত শক্তি সঞ্চিত হওয়ার ফলে প্রতি একশো বছরে তা প্রায় ৮.১ মাত্রার একটি প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের সমতুল্য শক্তি জমা করছে।
রাবার ব্যান্ডের তত্ত্ব ও ‘সেন্ট্রাল হিমালয়ান সিসমিক গ্যাপ’
বিজ্ঞানীদের মতে, ভূগর্ভের ভেতরে থাকা এই বিশাল পাতগুলির ধীরে ধীরে পিছলে যাওয়ার কথা। কিন্তু যখন এই ফাটল বা ফল্ট আটকে যায়, তখন তাদের স্বাভাবিক গতি থেমে যায় এবং পাথরের ওপর প্রচণ্ড চাপ বাড়তে থাকে। বিষয়টি অনেকটা রাবার ব্যান্ডকে অতিরিক্ত টেনে প্রসারিত করার মতো—যত টান পড়বে, চাপ তত বাড়বে। একসময় এই টান সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে রাবার ব্যান্ড যেভাবে হঠাৎ ছিঁড়ে যায়, তেমনই আকস্মিক এক ব্যাপক কম্পনের সৃষ্টি হয়, যা আমরা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভব করি।
উত্তরাখণ্ডের এই নির্দিষ্ট ফল্টটি দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকায় বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলটিকে ‘সেন্ট্রাল হিমালয়ান সিসমিক গ্যাপ’ (Central Himalayan Seismic Gap) বলে চিহ্নিত করেছেন। যেহেতু এই এলাকায় বিগত শতকগুলিতে বড় মাত্রার কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি, তাই এখানে নিরন্তর ভূ-শক্তি জমা হয়েই চলেছে। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, এই বিপজ্জনক ফল্টটি গাড়োওয়াল এবং কুমায়োঁ—উভয় অঞ্চলেই সমানভাবে ও অত্যন্ত শক্তভাবে আটকে রয়েছে।
ঝুঁকিতে ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি ও মেগাসিটিগুলি
গবেষকদের এই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে যে, উত্তরাখণ্ডে বড় মাত্রার ভূকম্পন হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে সংলগ্ন ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এই সমভূমিতে বসবাস করেন। এছাড়া রাজধানী দিল্লি, লখনউ, কানপুর এবং পাটনার মতো দেশের একাধিক প্রধান ও জনবহুল শহর এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা পুরনো ভবন, দুর্বল সেতু এবং অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলি এই বিপদের মুখে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ হয়নি দেবীবরণ, অন্ধকার মণ্ডপ; সিট-এর তদন্ত চলায় চোরবাগানে মায়ের বিসর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরিকাঠামোগত সতর্কতা
ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজির বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ড. নরেশ কুমার এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘‘ভূমিকম্প কবে বা কখন আঘাত হানবে, তার সঠিক দিনক্ষণ আগে থেকে কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। তবে হিমালয় অঞ্চলে ৭.৫ থেকে ৮ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প যে সুনিশ্চিত, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। প্রশ্ন শুধু এর সময় নিয়ে। এই নতুন গবেষণাটিও আমাদের সেই আশঙ্কাই জোরালোভাবে সমর্থন করছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখের উল্লেখ না থাকলেও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, প্রাকৃতিক এই বিপদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুতির সময় বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই।’’
এই সমীক্ষার সবচেয়ে বড় এবং তাত্পর্যপূর্ণ বার্তা হলো— উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের ভঙ্গুর ঢালে বর্তমানে নিয়মের তোয়াক্কা না করে অবাধে বহুতল বাড়ি ও হোটেল নির্মিত হচ্ছে। বহু জায়গায় নির্মাণ সংক্রান্ত সরকারি বিধি বা সেসমমিক জোন-এর নির্দেশিকা মানা হচ্ছে না। ফলে আগের পুরনো ও দুর্বল নির্মাণগুলি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা বড় বিপর্যয়ের দিনে ডেকে আনতে পারে এক বিরাট মানবিক সংকট।


