মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তীব্র ক্ষোভে ফুটছে ফ্রান্স। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন সহিংসতা ও সংঘর্ষের পর আবারও নতুন করে দেশজুড়ে বড় ধরনের আন্দোলনের প্রস্তুতি চলায় চরম আশঙ্কায় দিন গুনছে ফরাসি প্রশাসন। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ও নতুন করে হিংসা ঠেকাতে শনিবার পুরো ফ্রান্সে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বে আসছে চরম বিপর্যয়; সমুদ্রের নীচের ইন্টারনেটের তার কেটে দেবে ইরান!
‘গণতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা’ ও ম্যাক্রোঁর হুঁশিয়ারি
আগামী ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। তার ঠিক আগেই এই অনিয়ন্ত্রিত গণবিক্ষোভ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট এই আন্দোলন চলাকালীন ঘটে যাওয়া তাণ্ডবকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং প্রশাসনের তরফে ‘সর্বোচ্চ কঠোরতা’ অবলম্বনের স্পষ্ট নির্দেশ দেন। ম্যাক্রোঁর অভিযোগ, ‘অতি-বাম’ বা র্যাডিক্যাল গোষ্ঠীগুলি শেষ সপ্তাহান্তে রাজপথে সংঘাত সৃষ্টি করে দেশের ‘গণতন্ত্রকে ধূলিসাৎ করার চেষ্টা’ চালিয়েছিল। ফলে চলতি বিক্ষোভ হিংসাত্মক রূপ নিলে যে প্রশাসন এতটুকু রেয়াত করবে না, তা রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার।
সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানি ও ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ (Laurent Nuñez) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানান, শনিবার দেশজুড়ে নিরাপত্তা কঠোর করতে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র পুলিশ কর্মী নামানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ছড়ানো, সম্পত্তি ভাঙচুর ও বড় বড় শপিং মলে লুটপাটের জন্য আন্দোলনকারীদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। এর মোকাবিলায় ড্রোন নজরদারি ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ দ্রুত জবানবন্দির নির্দেশ! বিবিসির বিরুদ্ধে মানহানির মামলায় তলব এড়াচ্ছেন ট্রাম্প
প্রেক্ষাপট: ২০১৬-র শরণার্থী সংকট থেকে আজকের অর্থনৈতিক ধস
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশের মতে, আজকের ফ্রান্সের এই মারাত্মক সামাজিক সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে, ২০১৬ সালে।
-
অনিয়ন্ত্রিত শরণার্থী তোপ: ২০১৬ সালে সিরিয়া, মরক্কো ও উগান্ডার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলি থেকে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপমুখী হতে শুরু করে। সেই সময়ে ফরাসি লিবারেল ও বামপন্থী দলগুলি ‘রিফিউজিস ওয়েলকাম’ স্লোগান তোলে।
-
ম্যাক্রোঁর নীতি ও পরিকাঠামোয় চাপ: ওই বছরই রাজনীতির আঙিনায় উদীয়মান লিবারেল নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর। তিনি শরণার্থীদের ফরাসি অর্থনীতির ‘সামাজিক ও আর্থিক শক্তি’ আখ্যা দিয়ে জার্মানির খোলামেলা শরণার্থী নীতির প্রশংসা করেছিলেন।
-
সংকটের সূত্রপাত: কিন্তু অপরিকল্পিত ও বিপুল শরণার্থী ঢোকার ফলে ধীরে ধীরে ফ্রান্সের সামাজিক পরিষেবা এবং অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হতে শুরু করে। আবাসন সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। যে ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থা একসময় নিখরচায় উচ্চমানের পড়াশোনার জন্য বিখ্যাত ছিল, তার পরিকাঠামো ভেঙে পড়তে থাকে। স্কুলের শ্রেণীকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং অর্থাভাব প্রকট হয়ে ওঠে।
এরই পাশাপাশি লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি, পেট্রোল-ডিজেলের ক্রমবর্ধমান দাম ও জীবনযাত্রার খরচ আকাশ ছোঁয়ায় মধ্যবিত্ত ও সাধারণ নাগরিকদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। যে মানবিক আন্দোলনের ওপর ভর করে লিবারেল নেতৃত্ব ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছেছিল, বহু বছর পর সেই জমে থাকা ক্ষোভ ও পরিকাঠামোগত ধস আজ কোটি কোটি ফরাসি নাগরিককে রাজপথে টেনে নামিয়েছে।


