বিশেষ প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ:
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত তুঙ্গে উঠলে এবং ইরান যদি কৌশলগতভাবে পারস্য উপসাগর (Persian Gulf) বা সংলগ্ন সমুদ্রের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ইন্টারনেট ফাইবার কেবল (Submarine Cables) কেটে দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়, তবে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ভারতের ওপর পড়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার সঙ্গে ভারতের ডিজিটাল যোগাযোগের একটি বিশাল অংশ এই সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বে আসছে চরম বিপর্যয়; সমুদ্রের নীচের ইন্টারনেটের তার কেটে দেবে ইরান!

ভারতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
সমুদ্রের নিচে থাকা এই ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রধান সমস্যা তৈরি হতে পারে:
-
ইন্টারনেটের গতি শ্লথ ও লেটেন্সি বৃদ্ধি: ভারত থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকার দিকে যাওয়া ইন্টারনেট ট্রাফিকের বড় অংশ লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের ল্যান্ডলাইন ও সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এই রুট অবরুদ্ধ হলে ডেটাকে সুদূর পূর্ব দিক (সিঙ্গাপুর ও প্রশান্ত মহাসাগর) ঘুরিয়ে পাঠাতে হবে। এর ফলে ডেটা আদান-প্রদানের সময় (Latency) বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে।
-
বিপিও, আইটি ও আর্থিক খাতে প্রভাব: ভারতের প্রযুক্তি নির্ভর আইটি (IT), আউটসোর্সিং এবং আর্থিক লেনদেন ক্ষেত্রগুলি আন্তর্জাতিক রিয়েল-টাইম যোগাযোগের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। কেবল বিচ্ছিন্নতার ফলে আন্তর্জাতিক ক্লাউড সার্ভিস, শেয়ার বাজার ও ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে সাময়িক স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।
-
আন্তর্জাতিক ডেটা হাব ও ওটিটি পরিষেবা: গুগল, মেটা, বা অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল সার্ভার বা ডেটা সেন্টারের সাথে সরাসরি সংযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ দ্রুত জবানবন্দির নির্দেশ! বিবিসির বিরুদ্ধে মানহানির মামলায় তলব এড়াচ্ছেন ট্রাম্প
ভারত সরকার ও টেলিকম সংস্থাগুলির বিকল্প পরিকল্পনা
হঠাৎ এই ধরনের আন্তর্জাতিক সংকট বা নাশকতামূলক ঘটনা মোকাবিলা করার জন্য ভারত সরকার এবং দেশীয় প্রধান টেলিকম অপারেটরগুলি (যেমন টাটা কমিউনিকেশনস, জিও, এয়ারটেল) বহুস্তরীয় সুরক্ষাবলয় ও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রেখেছে:
-
বহুমাত্রিক রুট ও রিডানডেন্সি (Redundancy): ভারত কোনো একক কেবলের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারতের মুম্বাই ও চেন্নাই আন্তর্জাতিক গেটওয়ে থেকে একাধিক কেবল নেটওয়ার্ক (যেমন SEA-ME-WE series, AAE-1, IMEWE) সংযুক্ত। পশ্চিমের কোনো রুট ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রাফিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় রুটের দিকে ডায়ভার্ট বা পুনর্নির্দেশিত করা হয়।
-
স্যাটেলাইট ব্যাকআপ ও এলইও প্রযুক্তি: সাম্প্রতিককালে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক (যেমন OneWeb বা Jio Satellite) বিশ্বজুড়ে জরুরি মুহূর্তে ডেটা সংযোগ সচল রাখার বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। অতি-জরুরি পরিষেবা বা সরকারি ডেটা আদান-প্রদানে এই স্যাটেলাইট মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে।
-
দেশীয় ডেটা লোক্যালাইজেশন (Data Localisation): ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বর্তমানে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে ভারতীয় নাগরিকদের ডেটা দেশের ভেতরে থাকা ডেটা সেন্টারে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ফাইবার কেবল বিচ্ছিন্ন হলেও দেশের অভ্যন্তরে অনলাইন পেমেন্ট (UPI), স্থানীয় অ্যাপ এবং সরকারি ডিজিটাল পরিষেবাগুলি সচল থাকবে।
যদিও সামুদ্রিক ফাইবার কাটার মতো ঘটনা ঘটলে প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বিঘ্ন ও ইন্টারনেট শ্লথ হওয়ার সমস্যা তৈরি হবে, তবে একাধিক বিকল্প পথ ও আগাম প্রস্তুতির কারণে ভারতে দেশব্যাপী সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কঠিন।


