সৌমেন মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়াঃ
এই বাংলায় রয়েছে কতই না বিচিত্র সব রীতি-রেওয়াজ ও উৎসব । যেমন বাংলায় দোল উৎসব পেরিয়ে যাওয়ার পাঁচদিন পর পুনরায় ‘পঞ্চম দোল’ অনুষ্ঠিত হয় বাংলার বিভিন্ন গ্রামে । অর্থাৎ দোলের পাঁচদিন পর ফের আবির খেলায় মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা ।
আরও পড়ুনঃ বিপুল আয় রাজ্যের! দিঘা-মন্দারমণিতে রেকর্ড মদ বিক্রি
একেবারে বাংলায় দোলের যে নিয়ম-রীতি, অর্থাৎ দোলের আগের দিন হোলিকা দহন বা ন্যাড়া পোড়ানো থেকে শুরু করে দোলের দিন নারায়ণের শালগ্রাম শিলাকে ঘিরে যেভাবে ধর্মীয় ও উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে বাঙালিরা দোল পূর্ণিমায়, ঠিক সেই ভাবেই পঞ্চম দোলেও মেতে ওঠে চট্টরাজ পরিবার । পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের কুলটির মিঠানি গ্রামে এবং বাঁকুড়ার পুরন্দরপুরে এই পঞ্চম দোলের হদিশ পাওয়া যায় । দুটি গ্রামেই চট্টরাজ পরিবারের প্রাচীন উৎসব এই পঞ্চম দোল ।
রবিবার ছিল পঞ্চম দোল । দোল পূর্ণিমার পাঁচদিন পর এই পঞ্চম দোল অনুষ্ঠিত হয় । আসানসোলের কুলটির মিঠানি গ্রামে চট্টরাজ পরিবারের কুলদেবতা বাসুদেব চন্দ্র জিউকে ঘিরেই এই পঞ্চম দোল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে । 200 বছর আগে এই উৎসব শুরু হয়েছিল । কিন্তু কেন এই উৎসব শুরু হয়েছিল, তা এই প্রজন্মের কেউই জানে না ।
ভূ-ভারতে এমন উৎসবের আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না । তবে বাঁকুড়ার পুরন্দরপুরেও চট্টরাজ পরিবারের লোকেরাই পঞ্চম দোল পালন করে একইভাবে । মিঠানির চট্টরাজ পরিবারের সদস্যদের ধারণা বাঁকুড়ার পুরন্দরপুর আর মিঠানির চট্টরাজদের মধ্যে যোগসূত্রের মাধ্যমে এই দুই গ্রামে বহু প্রাচীন আমলে শুরু হয়েছিল পঞ্চম দোল ।
একেবারে দোল পূর্ণিমার মতোই সমস্ত নিয়মকানুন রীতি এই পঞ্চম দোলে । চট্টরাজদের প্রাচীন নারায়ণ শালগ্রাম শিলা বাসুদেবচন্দ্র জিউয়ের এই পঞ্চম দোল । তবে মিঠানি গ্রামে রয়েছে আরও দুই নারায়ণ শিলা । একটি লক্ষ্মী নারায়ণ জিউ এবং আরও একটি দামোদর চন্দ্র জিউ । পঞ্চম দোলের আগের রাতে বাসুদেব মন্দির থেকে বাসুদেবচন্দ্র জিউকে নিয়ে বাকি দুই নারায়ণ মন্দিরে গিয়ে তাদেরও একই সিংহাসনে নিয়ে নেওয়া হয় ।
তারপর শোভাযাত্রা করে গ্রামের শেষে গিয়ে অনুষ্ঠিত হয় হোলিকা দহন অনুষ্ঠান চাঁচর পোড়ানো । পরদিন অর্থাৎ পঞ্চম দোলের সকালে বাসুদেব চন্দ্র জিউকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হয় চট্টরাজদের দোল মন্দিরে । সেই দোল মন্দিরে বাসুদেবকে দোলানো হয় । পুজো-অর্চনা ও দেবতাকে আবির মাখিয়ে উদযাপিত হয় পঞ্চম দোল ।
একদিকে ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজ যেমন রয়েছে পঞ্চম দোলকে ঘিরে । তেমনই তার পাশাপাশি এই দোলে আবার ফিরে আসে রং খেলার উৎসব । অর্থাৎ চট্টরাজ পরিবারের মেয়েরা, গৃহবধুরা এবং পরিবারের অন্যরা আবারও রং খেলার আমেজে মেতে ওঠেন । তবে এক সময় এই উৎসব শুধুমাত্র চট্টরাজ পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । এখন গ্রামের অন্যান্যরাও এই উৎসবে সামিল হয়ে দোলের পর আবারও রং খেলায় মেতে উঠেন । আনন্দে মেতে উঠেন । চট্টরাজ পরিবারের আত্মীয় কিংবা মেয়েরা, যাদের বাইরে বিয়ে হয়েছে তারা এই উৎসবে আবারও গ্রামে ফিরে আসেন । একটা মিলন উৎসবের চেহারা নেয় এই পঞ্চম দোলে ।
আরও পড়ুনঃ গতকাল শনিবার রাতে ফের আতঙ্ক জলপাইগুড়িতে! টাইমে পুলিশ পৌঁছাতেই উদ্ধার…
চট্টরাজ পরিবারের মেয়েরা বর্তমানে বিবাহ সূত্র বাইরে থাকেন ৷ তেমনই একজন বিচিত্রা চট্টোপাধ্যায় (চট্টরাজ) ৷ তিনি বলেন, “আমরা আমাদের পুরনো ঐতিহ্য এখনও পর্যন্ত ধরে রেখেছি । এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া । যেখানে সবাই স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে নিজেদের পরম্পরা ঐতিহ্যকে ভুলতে বসেছে । সেখানে আমরা প্রাচীন পঞ্চম দোল উৎসবকে আজও বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি । আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে এটা দিয়ে যেতে পারছি । বাংলার এই কৃষ্টি, ঐতিহ্য বেঁচে থাক ।”
চট্টরাজ পরিবারের আরেক মেয়ে তনুশ্রী ভট্টাচার্য (চট্টরাজ) বলেন, “এই পঞ্চম দোলের সময় আমরা গ্রামে ফিরে আসি । আমাদের আবার রঙ খেলায় খুব আনন্দ হয় । আমরা গর্বিত হই যে আমাদের পরিবারেই এই ব্যতিক্রমী এবং বিরল দোল খেলা রয়েছে ।”
চট্টরাজ পরিবারের গৃহবধূ প্রিয়াঙ্কা চট্টরাজ বলেন, “আমি বিয়ের পর যখন প্রথম এসে এই উৎসব দেখি, তখন বেশ অবাক হয়েছিলাম । কিন্তু এখন বেশ আনন্দ লাগে । দোলের পর আবারও আমাদের রং খেলার সুযোগ আসে এই পঞ্চম দোলে । আমরা আনন্দে মেতে উঠি ।” বসন্ত উৎসব ফিরে এসে আবারও যেন জানান দিল, ‘যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও’।









