গত সপ্তাহে ছিল মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জন্মদিন। তিনি একদিকে বৌদ্ধতন্ত্রের বিপুল ভাণ্ডারে বাঙালির শিকড় আবিষ্কার করেছেন, বাঙালিকে দিয়েছেন চর্যাপদের সন্ধান। আবার তিনিই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে প্রাচীন পীঠ ও মাতৃমূর্তি আবিষ্কার করে মাতৃসাধনার ধারাকে পুনরায় সঞ্জীবিত করেছেন। আজ বঙ্গবার্তায় জানব তেমনই এক মাতৃপীঠের কথা। সেই পীঠ হল বর্ধমান জেলার নিরোলের কাছে কেতুগ্রামের কাছে ঈশানী নদীতীরের অট্টহাস পীঠ।
আরও পড়ুনঃ বড় ক্ষতি! লালগ্রহের সাথে ‘যোগাযোগ ছিন্ন’; স্তব্ধ নাসার মহাকাশযান ‘মাভেন’?
এই পীঠে পাল ও সেনযুগে পূজিত হতেন মা দন্তুরা চর্চিকা। এই প্রসঙ্গে গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়ের সিদ্ধান্ত হল:
অষ্ট চামুণ্ডা রূপের অন্যতম দন্তুরা চামুণ্ডা পূজিত হতেন বর্ধমানের কেতুগ্রাম থেকে চার কিলোমিটার দূরে ঈশানী নদীর তীরে দক্ষিণ ডিহি গ্রামে একটি প্রাচীন পীঠস্থানে, যাকে নগেন্দ্রনাথ বসু শক্তিপীঠ অট্টহাস বলে দাবি করেছেন, যদিও দীনেশ সরকারের মতে এটি অট্টহাস ক্ষেত্র নয়, অট্টহাস হল বীরভূমের লাভপুরে। ঐতিহাসিক বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখে বলা যায় যে এই স্থানে সতীর অধর প্রোথিত আছে এই বিশ্বাসে এখানে উপাস্য মাকে অধরেশ্বরী বলা হয়।
দক্ষিণডিহির পীঠস্থানে পূজিত দন্তুরা চামুণ্ডা মূর্তিটি পাশের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়, সম্ভবত মধ্যযুগে ইসলামিক আগ্রাসনের সময় মূর্তিটি বাঁচাতে পুকুরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। তখন এ স্থানের নাম ছিল খুলারামপুর বা তুলারামপুর।পরবর্তীতে এই গ্রামের নাম দক্ষিণ ডিহি হয়।এই গ্রামে কিছু কৃষক বাস করত।তারা মাঠে চাষবাদ করত। ঈশানি নদীর ধারে অবস্থিত এ স্থান ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়
দক্ষিণডিহি গ্রামের সেই দন্তুরা চামুণ্ডা মায়ের মূর্তিটি উদ্ধার করেন। পরবর্তী সময়ে সেই মূর্তি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ মিউজিয়ামে এনে রাখা হয়।

ডাকার্ণব তন্ত্রের সূত্র ধরে মা দন্তুরার এই একই বিগ্রহ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় খুঁজে পেয়েছিলেন বীরভূমের কঙ্কালী সতীপীঠেও। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনাবলীতে বীরভূমের কঙ্কালিনী পীঠে কদম্ব বৃক্ষমূলে অধিষ্ঠিতা সেই অট্টহাস দেবীর মূর্তির বিবরণ পাই। অট্টহাস দেবী শীর্ণকায়া, অস্থিচর্মসারা। উৎকটাসনে অর্থাত্ হাঁটু ভাঁজ করে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসে আছেন। তিনি করালবদনা। ক্ষুৎক্ষামা অর্থাত্ সদাই রিপুগণকে ভক্ষণের জন্য ক্ষুধাতুরা। দেবীর মুখমণ্ডল যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে।
আরও পড়ুনঃ প্রীতি যোগে উত্তর ফাল্গুনী নক্ষত্র, সাফল্য না ব্যর্থতা, কী আছে এই চার রাশির ভাগ্যে?
পালযুগে দন্তুরা মাতৃকার অট্টহাস রূপে পরিচিত হওয়ার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাবর্ণ গোত্রীয় বেদগর্ভের পুত্র ছিলেন বশিষ্ঠ। তাঁর তিন পুত্র মহাদেব, ভবদেব ( প্রথম) ও অট্টহাস। প্রথম ভবদেবের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ ভবদেব ভট্ট; একাদশ শতকের বিখ্যাত পণ্ডিত। এই বংশতালিকার মধ্যে উল্লিখিত অট্টহাস সতীপীঠ অট্টহাসের আদি সাধক রূপে পরিচিত। ভবদেব ভট্টের সময়কাল বিবেচনা করলে এই অট্টহাস দশম শতাব্দীর প্রথমদিকে বর্তমান ছিলেন।
বর্ধমানের অধরেশ্বরী অট্টহাস সতীপীঠে দেবী ফুল্লরা ও ভৈরব বিশ্বেশ। সারা বছর এখানে ভক্তরা আসে। তবে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস এ পাঁচ মাস এখানে বহু ভক্তের সমাগম হয় । দোলের সময় এখানে বিশাল মেলা বসে। এখানে থাকার জন্য অতিথি নিবাস আছে। মন্দির থেকে ভক্তদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কাটোয়া থেকে এখানে আসার সুবিধা। কেতুগ্রামের নিরোল বাস স্ট্যান্ড থেকে চার কিলোমিটার দূরে মায়ের মন্দির।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জয় হোক। বাঙালির মাতৃসাধনার ধারা তাঁর মতো মনীষীর প্রতিভার আলোয় চিরকাল আলোকিত থাকুন। মায়ের অট্টহাসিতে কেঁপে উঠুক ভণ্ড গুরুভজা কৃমিকীট প্রতিষ্ঠানে বসে থাকা বাঙালির ঘরশত্রুদের হৃদয়।





