উত্তরপ্রদেশের বাগপত জেলায় একটি খাপ পঞ্চায়েতের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। সম্প্রতি ওই এলাকার খাপ পঞ্চায়েত ঘোষণা করেছে, ১৮ বছরের নীচে কোনও কিশোর বা কিশোরী প্রকাশ্যে হাফ প্যান্ট পরতে পারবে না এবং স্মার্টফোন ব্যবহারও করা যাবে না। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য পশ্চিমি সংস্কৃতির “অবাঞ্ছিত প্রভাব” থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরও মজবুত করা। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যত সামাজিক বিধিনিষেধ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যদিও খাপ পঞ্চায়েতের কোনও আইনি ক্ষমতা নেই।
আরও পড়ুনঃ শুনতে অবাক লাগছে! বিজেপি-কে হারাতে জোট বাঁধল বাম-তৃণমূল
উত্তর ভারতের গ্রামাঞ্চলে খাপ পঞ্চায়েত নতুন বিষয় নয়। ঐতিহ্যগতভাবে জাতিভিত্তিক এই সভাগুলি বহু দশক ধরেই সামাজিক নিয়ম-কানুন নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। বিবাহ, পোশাক, মোবাইল ব্যবহার কিংবা যুবসমাজের আচরণ—বিভিন্ন বিষয়ে তাদের নির্দেশ প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাগপতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তও তার ব্যতিক্রম নয়। খাপ নেতাদের বক্তব্য, আজকের প্রজন্ম স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কমছে এবং “অশালীন পোশাকের” প্রভাব গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
খাপ পঞ্চায়েতের এক প্রতিনিধির দাবি, “১৮ বছরের নীচের ছেলেমেয়েদের হাতে স্মার্টফোন থাকলে তারা ভুল পথে যেতে পারে। পড়াশোনা ও পারিবারিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়। একইভাবে হাফ প্যান্ট বা পশ্চিমি পোশাক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়।” তাঁদের মতে, এই বিধিনিষেধ সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্স (আগের টুইটার)-এ বহু মানুষ একে মধ্যযুগীয় ও অবৈজ্ঞানিক বলে কটাক্ষ করেছেন। সমালোচকদের বক্তব্য, পোশাক বা প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর এভাবে নিষেধাজ্ঞা চাপানো ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী এবং সংবিধান স্বীকৃত অধিকারের লঙ্ঘন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও বেসরকারি ও অনির্বাচিত সামাজিক গোষ্ঠী কীভাবে নাবালকদের জীবনযাপনের নিয়ম ঠিক করতে পারে?
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, খাপ পঞ্চায়েতের এমন নির্দেশের কোনও আইনি বৈধতা নেই। কেউ তা জোর করে কার্যকর করতে গেলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করার অধিকার রয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন খাপ পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত আদালতে খারিজ হয়েছে। তবু বাস্তবে গ্রামাঞ্চলে সামাজিক চাপে অনেক পরিবার এই ধরনের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়—এটাই বড় উদ্বেগের বিষয়।
আরও পড়ুনঃ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা; মৃত উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালের জুনিয়র চিকিৎসক
অন্যদিকে, কিছু মানুষ খাপ পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্তকে সমর্থনও করছেন। তাঁদের যুক্তি, বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছিল, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকলে কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও ঘুমের সমস্যা বাড়তে পারে। এই যুক্তি তুলে ধরে সমর্থকদের একাংশ বলছেন, খাপ পঞ্চায়েত অন্তত সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধান নিষেধাজ্ঞায় নয়, সচেতনতা ও শিক্ষার মাধ্যমে হওয়া উচিত। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করা দরকার ঠিকই, কিন্তু তা পরিবার ও স্কুলের যৌথ আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত, সামাজিক ভয় বা শাস্তির ভেতর দিয়ে নয়। একইভাবে পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করলে কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও আত্মপরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই ঘটনাকে ঘিরে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে কড়া কোনও বিবৃতি না এলেও, সূত্রের খবর, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
সব মিলিয়ে বাগপতের খাপ পঞ্চায়েতের এই সিদ্ধান্ত আবারও সামনে এনে দিল গ্রামীণ রক্ষণশীলতা বনাম আধুনিক অধিকারবোধের সংঘাত। একদিকে সংস্কৃতি ও সামাজিক শৃঙ্খলার যুক্তি, অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আধুনিক মূল্যবোধ—এই টানাপোড়েনই এখন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। ১৮ বছরের নীচে হাফ প্যান্ট ও স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, না কি শুধুই প্রতীকী বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশবাসী।









