অনান্য সবার কাছে ইনি বড় শীতলা মাতা নামে পরিচিত হলেও, আপামর সালকিয়া তথা উত্তর হাওড়াবাসির কাছে বড়মা নামেই পরিচিত। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন বড়মা। আমরা ছোট থেকে বড়মা বলতে শুধুমাত্র এনাকেই বুঝি। আমরা যারা সালকিয়ায় থাকি, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি, কারণ আমরা জন্মসূত্রে বড়মাকে পেয়েছি। ইনি সালকিয়া তো বটেই, এমনকি উত্তর হাওড়া তথা হাওড়া জেলার একমাত্র অভিভাবক। যত শীতলা মায়েরা রয়েছেন, ইনি সবার থেকে বয়সে বড়। তাই ইনি বড়মা। আজ বলবো সেই বড়মাকে নিয়ে।
আরও পড়ুনঃ হেল্পলাইন চালু কলকাতা পুলিশের, রাত পোহালেই মাধ্যমিক!
সালকিয়ায় অরবিন্দ রোডের ঠিক মাঝখানে বড় মায়ের মন্দির। মা কিন্তু বরাবর অরবিন্দ রোডে ছিলেন না। মা ছিলেন শ্রীরাম ঢ্যাং রোডে একটি গলির ভিতরে। এখন প্রশ্ন হলো মা এখানে এলেন কিভাবে?
ঠিক কত বছর আগে বড় মায়ের আবির্ভাব সালকিয়ায় হয়, সেই কথা কেউই সঠিক করে বলতে পারবেন না। কেউ বলেন দেড়শো, কেউ বলেন দুশো, কেউ বলেন তারও বেশি। যাইহোক বড় মায়ের আদি বাড়ি শ্রীরাম ঢ্যাং রোডে। যেখানে বড় মায়ের আদি বাড়ি, সেখানেই একটি পুকুর থেকে স্বপ্নাদেশে মায়ের ঘট পাওয়া যায়। বর্তমানে যে বিগ্রহ পূজিত হয় পরে আবার স্বপ্নাদেশেই তা নির্মাণ করা হয়। বড় মায়ের বিগ্রহ নিম কাঠের তৈরি। বড় মায়ের বিগ্রহ তৈরির জন্য যে নিম গাছের কাঠ প্রয়োজন হয়েছিল, সেই নিম গাছটি ছিল সালকিয়া শ্মশান ঘাট সংলগ্ন এলাকায়। গাছটি ছিল অক্ষয় কুমার ঘোষাল মহাশয়ের। তিনিই গাছটি দান করেন মায়ের বিগ্রহ নির্মাণের জন্য। তাই আজও প্রতি বছর স্নান যাত্রার দিন নগর পরিক্রমা করার সময়, মায়ের শোভাযাত্রা যখন শ্মশানের সামনে দিয়ে যায়, তখন একবার শ্মশানের দিকে মায়ের পালকি ঘোরানো হয়। মা আদি বাড়িতে থাকতে চাননি, তাইতো স্বপ্নাদেশ দিয়ে অরবিন্দ রোডে চলে আসেন।
আরও পড়ুনঃ বঙ্গে বিশেষ নজর মোদীর সরকারের! দুর্গাপূর থেকে ডানকুনিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা
সারা বছর মন্দিরে বসে অগনিত ভক্তদের দেখেন। আর বছরে একটা দিন, সেই ভক্তদের কাঁধে চেপেই নগর পরিক্রমায় বের হন। এই নগর পরিক্রমা করার সময় প্রথমে ভাই পঞ্চাননদেবের সঙ্গে দেখা করেন, এবং তারপর ছোট বোনের সাথে দেখা করে, অবশেষে স্নান করে বাড়ি ফেরেন। বড়মা বাঁধাঘাটে স্নান করেন। প্রত্যেক উপবাসী ভক্তরা এই একটা দিন মাকে স্পর্শ করে স্নান করানোর সুযোগ পান। সমগ্র উপবাসী ভক্তদের স্নান করানো হয়ে গেলে, বড় মায়ের বাড়ির সদস্যরা মাকে স্নান করান। তারপর মায়ের পুরোহিতরা মাকে স্নান করান। তারপর ঘাটেই মায়ের বিশেষ পুজো হয়। তারপর ভাইয়ের দেওয়া শাড়ি পরিধান করেন। তারপর হয় মায়ের বরণ। বরণের পর মা আবার ভক্তদের কাঁধে চেপেই বাড়ি আসেন। বাড়িতে ফিরে মায়ের গর্ভগৃহে প্রবেশের পর, গর্ভগৃহের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ দরজার আড়ালে মাকে পুণরায় নতুন করে সাজিয়ে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর সবার দর্শনের জন্য গর্ভগৃহের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শুরু হয় মায়ের অভিষেক। তারপর শুরু হয় মায়ের বিশেষ পুজো। যা চলে পরদিন রাত্রি পর্যন্ত। স্নান যাত্রার পরদিনের এই পুজোর নাম ষোলআনা পুজো। ষোলআনা পুজোকে সাধারণত দেশ ষোলআনা পুজো বলা হয়। অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে যত শীতলা মায়েরা রয়েছেন, সবার নাম করে বড় মায়ের কাছে পুজো দেওয়া। এরপর আটদিন মায়ের বিশেষ পুজো হয়। আটদিন মা আর সাজ পরিবর্তন করেন না। আটদিন পর মায়ের সাজ পরিবর্তন করে নতুন করে মাকে সাজানো হয়। ষোলআনা পুজোর কয়েকদিন পর থেকেই মায়ের মন্দিরে গান, যাত্রাপালা, নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে মায়ের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হয়।
প্রায় শত শত বছর ধরে এভাবেই মাঘী পূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ভগবতী বড়মার স্নান যাত্রা উৎসব পালিত হয়ে আসছে। লক্ষ লক্ষ ভক্তরা আসেন, মায়ের এই স্নান যাত্রা উৎসব চাক্ষুষ দর্শন করতে।





