Wednesday, 21 October, 2026
21 October
HomeকলকাতাBijoya Dashami: দেবীবরণের কুলোর খোঁজে বাঙালি; বদলের হাওয়ায় ‘মডার্ন’ হয়েছে বরণডালা

Bijoya Dashami: দেবীবরণের কুলোর খোঁজে বাঙালি; বদলের হাওয়ায় ‘মডার্ন’ হয়েছে বরণডালা

বাঙালি তার ঐতিহ্যকে ভোলে না, শুধু সময়ের সঙ্গে তাকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

বিশেষ প্রতিবেদন:


ষষ্ঠী থেকে নবমী— দেখতে দেখতে কেটে যায় শারদোৎসবের দিনগুলি। ঢাকের তালে, আলোর রোশনাইয়ে আর ভিড়ের আনন্দে কখন যে বিদায়ের সুর বেজে ওঠে, টেরই পাওয়া যায় না। আর দশমী এলেই মনটা ভার। ঘরের মেয়ে উমার শ্বশুরবাড়ি ফেরার পালা। তাই শেষ দিনের আয়োজনে কোনও খামতি রাখতে চান না কেউই। সিঁদুরে, মিষ্টিমুখে, আলিঙ্গনে সেরে নেওয়া হয় বরণপর্ব। পুজোশেষে ভালবাসা আর চোখের জলেই মা-কে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু।

সংসারের মঙ্গল কামনায় দেবীবরণে আজও নিষ্ঠাভরে মানা হয় কিছু চিরাচরিত নিয়ম। স্নান সেরে শুদ্ধ বসনে, হাতে শাঁখা-পলা, আলতা-সিঁদুর পরে তবেই শুরু হয় বরণের আচার। অনেক বাড়িতে আবার বরণের আগে মাছ ছুঁয়ে নেওয়ারও রীতি রয়েছে। আর বরণের মূল আকর্ষণ তো বরণডালা! আগে থেকেই যত্ন করে সাজিয়ে নিতে হয় সেই ডালা। প্রদীপ, মঙ্গলঘট, কলা, পান, সুপারি, হরীতকী, ধান-দূর্বা, সিঁদুর, পানের খিলি, লাল-হলুদ সুতো, কাজললতা, আলতাপাতা, আয়না-চিরুনি, শাঁখা-পলা, লোহা, মিষ্টি আর ষোলো আনা— পুজোর এই সব উপকরণে দিয়েই সেজে ওঠে দেবীর বরণডালা। নিয়মটা একই আছে, বদলেছে শুধু ডালার সাজ। দশকর্মা ভান্ডারের সেই চেনা ছিমছাম বরণডালার দিন এখন অতীত। তার জায়গা নিয়েছে ডিজ়াইনার স্টুডিয়ো বা অনলাইন থেকে কেনা নকশাদার, হ্যান্ডক্রাফ্‌টেড বরণডালা। ঐতিহ্যের সঙ্গে এখন মিশেছে ট্রেন্ডের ছোঁয়া।

আরও পড়ুনঃ  মাগো এ বার বিদায় তবে, আসছে বছর আবার হবে! শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা

একটা সময় ছিল, যখন পুজোর সামগ্রী কেনার একটাই ঠিকানা! দশকর্মা ভান্ডার থেকেই ফর্দ মিলিয়ে পুজোআচ্চার উপকরণগুলি কেনা হত। দেবীবরণে বাঁশের কুলো কিংবা পিতলের বরণডালার ব্যবহারই চলে এসেছে বছরের পর বছর ধরে। এখন সেই ডালা কিনতে ভিড় হচ্ছে ডিজ়াইনার স্টুডিয়ো আর অনলাইন শপিং সাইটে। কিন্তু কেন এই গন্তব্যবদল?

এখন সব কিছুই ছবিবন্দি করার চল শুরু হয়েছে। বরণের ছবি উঠবে সমাজমাধ্যমে, তাই ডালাটিকেও হতে হবে ‘ফোটোজেনিক’। এক বার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয় না, ডিজ়াইনার ডালাগুলি এতটাই সুন্দর দেখতে হয় যে, পরে ঘর সাজানোর কাজে বা ফল-মিষ্টি রাখার ট্রে হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তাই দাম একটু বেশি হলেও আপত্তি নেই ক্রেতাদের। কেউ চাইছেন দেবী দুর্গার মুখ আঁকা বরণডালা, কেউ আলপনা আঁকা ডালার খোঁজ করছেন, কেউ আবার চাইছেন পদ্মফুলের মোটিফ। অনলাইনে অর্ডার দিলেই মনের মতো নকশার বরণডালা বাড়ির দুয়ারে এসে পৌঁছে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কাকুড়গাঁছির ভিআইপি মার্কেটের দশকর্মা ব্যবসায়ী শঙ্করলাল শর্মা বলেন, ‘‘বিজয়া দশমী হোক বা বিয়ে, সাদামাঠা বরণডালাই বিক্রি করে আসছি প্রায় ৪৫ বছর ধরে। কুলোর ডালার উপর রং দিয়ে ফুলেল নকশা করা থাকে। এখন সেই বরণডালার দাম হয়েছে ১০০ টাকার কাছাকাছি। বিক্রি এখনও ভালই আছে। তবে অনেকেই এখন এসে ডিজ়াইনার বরণডালার খোঁজ করছেন বটে। যাঁরা একটু অন্য রকম চাইছেন, তাঁরা অনলাইনেই কিনে নিচ্ছেন।’’

অন্য দিকে, টালিগঞ্জের এক হোমমেড ক্রাফ্‌ট স্টুডিয়োর কর্ণধার রাজীব শুক্ল জানালেন, ‘‘গত দু’বছরে নকশা করা বরণডালার চাহিদা তিন গুণ বেড়েছে। ৪০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত দামের ডালা বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্রেতাই ২৫-৪০ বছরের মহিলা।’’

অনলাইন শপিং সাইট ‘কারুকার্য’-তে বরণডালার সেট বিক্রি হচ্ছে ১,৫৯৯ টাকায়। সেই সেটে থাকে একটি হাতে আঁকা কলকা-কুলো, পাঁচটি মঙ্গলঘট, একটি আইসোরা এবং একটি স্ট্যান্ডিং প্রদীপদানি। বাইরে থেকে এই সব কিনলে ৫০০ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়, তবুও হাতের কাজের দাম তো দিতেই হবে! শ্যামবাজারের মোড়ে বগলাচরণ কুন্ডু নামক দোকানেও হাতে নকশা করা কাঁসা-পিতলের বরণডালা সেট বিক্রি হচ্ছে। এক জনপ্রিয় শপিং সাইটে বরণের সব উপকরণ সমেত বরণডালার সেট বিক্রি হচ্ছে ২,৮৯৯ টাকায়। দশকর্মার দোকানের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ফর্দ মেলানোর বদলে বাড়িতে ঠান্ডা ঘরে বসে এক ক্লিকেই বরণডালা কিনে ফেলছে আজকের প্রজন্ম। দশকর্মার দোকানে যে সেটটি কিনতে হয়তো ১০০০ টাকাও খরচ হয় না, সেটাই প্রায় তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে অনলাইন সাইটগুলি। আরামের স্বার্থে, ঝক্কি এড়াতে সেই টাকা হাসি মুখে খরচ করছে বাঙালি।

আরও পড়ুনঃ  আজ দশমী থেকে টানা ৪ দিন টালা পর্যন্ত যাবে একাধিক ট্রেন! প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য ব্যাহত হবে চক্ররেল পরিষেবা

ঐতিহ্য আর সাম্প্রতিকতার এই মেলবন্ধনই আসলে বাঙালির দুর্গাপুজোর ইউএসপি হয়ে উঠেছে এখন। নিয়মে কোনও ফাঁকি নেই, শুধু উদ্‌যাপনের ধরনটা একটু বেশি নান্দনিক, একটু বেশি গোছানো হয়েছে। মা-কে বিদায় জানানোর আয়োজনেও তাই এখন মিশে থাকছে সৌকর্যের ছোঁয়া।

আসলে বরণডালা নিছক একটা ‘ট্রে’ নয়, তা বাঙালির আবেগের একটা অংশ। আগে মা-ঠাকুরমারা নিজের হাতে আলতা দিয়ে কলকা আঁকতেন বরণ ডালায়, এখন সেই কাজটাই করছেন ডিজাইনাররা। আরও নিখুঁত ভাবে, আরও চাকচিক্যের সঙ্গে। আড়ম্বর হয়তো বেড়েছে, তবে উদ্দেশ্য একই আছে— ঘরের মেয়েকে পরম যত্নে বরণ করে নেওয়া। দশকর্মা ভান্ডারের বাঁশের ডালা থেকে অনলাইন স্টোরের হ্যান্ডপেন্টেড কুলো— এই যাত্রাটাই প্রমাণ করে, বাঙালি তার ঐতিহ্যকে ভোলে না, শুধু সময়ের সঙ্গে তাকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন