মূল সমস্যা ডলারে। মার্কিনি মূদ্রায় ব্যবসা করতে না চাইলেই ঢিল পড়ে যায় মৌচাকে। কালে কালে আমেরিকার সেই রোষেরই বলি সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি। একেবারে শেষ সংযোজন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো।
আরও পড়ুনঃ চাপে সিপিএম! ফ্রন্টের বাইরে জোট “নপসন্দ” শরিকদের
মাদক পাচার, মাদক বিক্রির টাকা আমেরিকায় সন্ত্রাসবাদ চালান করার অভিযোগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গিয়েছে ডেনাল্ড ট্রাম্পের ডেল্টা ফোর্স। এমনটাই জিগির তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু রাজ্য নৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি পুরনো সংঘাতের ফল। ভেনেজুয়েলায় হামলার মধ্যে ধরা পড়ছে পুরনো একটি প্যাটার্ন। যখনই কোনো দেশ তাদের তেল বিক্রির জন্য মার্কিন ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনো মুদ্রা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখনই আমেরিকা সেই দেশের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও অনেকে একই কারণ দেখছেন।
অনেকের মতে, এই সংকটের শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে, যখন ভেনেজুয়েলা নিজেদের মার্কিন ডলারের নির্ভরতা থেকে মুক্ত ঘোষণা করে। এই ঘটনার পর ভেনেজুয়েলা চিনের কাছে ইউয়ান মুদ্রায় তেল বিক্রি শুরু করে।
এই পদক্ষেপটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবে নেয়নি, কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল যে এর ফলে চিন একসময় বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার আধিপত্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০০০ সালে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। সেই সময় সারা বিশ্বে, এমনকি ভারতেও ইরাকি তেল আসত। সাদ্দাম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তিনি তেলের দাম ডলারের বদলে ইউরোতে গ্রহণ করবেন। তার এই সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছিল।
লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি চেয়েছিলেন পুরো আফ্রিকার জন্য একটি একক মুদ্রা চালু করতে, যার নাম হতো ‘আফ্রিকান গোল্ড দিনার’। এই মুদ্রাটি সরাসরি সোনার মজুত দ্বারা সমর্থিত হতো। উদ্দেশ্য, মার্কিন ডলার এবং ফরাসি মুদ্রা ‘সিএফএ ফ্রাঙ্ক’-এর ওপর আফ্রিকার নির্ভরতা কমানো। পশ্চিমি দেশগুলো একে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। হিলারি ক্লিনটনের একটি ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকেও জানা যায় যে, গাদ্দাফি তেলের বিনিময়ে সোনা চেয়েছিলেন। এর ফলে ২০১১ সালে ন্যাটোলিবিয়ায় বিমান হামলা চালায়। গাদ্দাফির মৃত্যুর সাথে সাথেই এই সোনার মুদ্রার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।
আমেরিকার পদক্ষেপের ফলে ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিনের ইউয়ান কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার সংকটের সময় চিনের জমানো সোনার মজুত এবং ইউয়ানের প্রসার বাধাপ্রাপ্ত হয়। গত ডিসেম্বরে মার্কিন হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার মন্তব্য করেন যে, ভেনেজুয়েলা আমেরিকার সম্পদ ও সম্পত্তি “চুরি” করেছে।
ভেনেজুয়েলা দীর্ঘ দিন ধরে ব্রিকস জোটে (ভারত, ব্রাজিল, চিন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে এই জোটের নেতৃত্বে আছে ভারত (ভারত ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্রিকসের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে)। ভারত, রাশিয়া এবং চিন নিয়মিতভাবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলছে। ব্রিকস দেশগুলো এখন নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যবসা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। ভারত গত বছর থেকেই ব্রিকস দেশগুলোকে ভারতীয় রুপিতে লেনদেন করার অনুমতি দিয়েছে, যাতে মার্কিন ডলারের ওপর চাপ কমানো যায়।
ইতিহাস বলছে, যখনই কোনো দেশ (যেমন: ইরাক, লিবিয়া বা ভেনেজুয়েলা) ডলার ছেড়ে সোনা বা অন্য মুদ্রায় তেল বিক্রি করতে চেয়েছে, তখনই তারা সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ভারত ও চিনের মতো দেশগুলো ‘ব্রিকস’-এর মাধ্যমে ডলারের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছে। হয়তো এতে বিপদ বাড়ছে ভারতের।









