spot_img
Thursday, 15 January, 2026
15 January
spot_img
HomeকলকাতাMerry Christmas: ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ প্রভাব, পর্তুগিজদের আগমন; পশ্চিমবঙ্গে বড়দিন পালন বাঙালী...

Merry Christmas: ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ প্রভাব, পর্তুগিজদের আগমন; পশ্চিমবঙ্গে বড়দিন পালন বাঙালী সাংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে গেল

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিলিগুড়ি,যা উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার উৎসবের এক নতুন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ

ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষত কলকাতা, ভারতীয় উপমহাদেশের খ্রিস্টান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ব্রিটিশ শাসনের দীর্ঘ প্রভাব এবং পর্তুগিজদের প্রাথমিক আগমনের ফলে এই ভূখণ্ডে বড়দিন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব থাকেনি, বরং এটি এক সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র এবং সর্বজনীন আনন্দে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গে বড়দিন পালনের ইতিহাসের মূল পর্যায়গুলি ও তার সাংস্কৃতিক বিবর্তন আলোচনা করা হলো।

দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি,উত্তরবঙ্গের বড়দিন পালনের ইতিহাসেও রয়েছে, মূলত ঔপনিবেশিক প্রভাব।পাহাড়ি সংস্কৃতি এবং বাঙালির লোক-ঐতিহ্যের এক অনন্য মিশ্রণ।পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরবঙ্গের বড়দিনের উৎসবে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র পরিলক্ষিত হয়।

আরও পড়ুনঃ হাদির মৃত্যুতে বিক্ষোভের আঁচ পৌঁছল এপার বাংলাতেও, শিলিগুড়ির মশাল মিছিলে ইউনুসের কুশপুতুল দাহ

ঐতিহাসিক পটভূমি:বাংলায় খ্রিস্টধর্মের গোড়াপত্তন

পশ্চিমবঙ্গে বড়দিন পালনের ইতিহাস মূলত পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশ এই দুই ঔপনিবেশিক শক্তির আগমনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পর্তুগিজদের প্রাথমিক প্রভাব (ষোড়শ শতক)

যদিও বৃহত্তর বাংলায় খ্রিস্টধর্মের বীজ ১৬শ শতকে পর্তুগিজদের হাত ধরে আসে, কিন্তু আধুনিক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ভূগোলে এর সবচেয়ে বড় ছাপ ফেলে ব্রিটিশরা। তবে, প্রাচীন হুগলি জেলার ব্যান্ডেল এবং কলকাতা লাগোয়া কিছু অঞ্চলে পর্তুগিজদের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে বড়দিন পালিত হতে শুরু করে।

এরপর,১৬৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডেল চার্চ, ভারতের প্রাচীনতম খ্রিস্টান উপাসনালয়গুলির মধ্যে অন্যতম। এই চার্চে পর্তুগিজ রীতিতে বড়দিন পালনের সূচনা হয়।যা,স্থানীয়দের মধ্যে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের প্রথম পরিচয় ঘটায়।

ব্রিটিশ শাসকদের ভূমিকা (১৭শ শতকের শেষভাগ)

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে বড়দিন উৎসব পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষত কলকাতায়, প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।প্রথম ১৬৬৮ সালে জব চার্নক,যিনি কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।তিনি সুতানুটিতে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বড়দিনের ছুটি ঘোষণা করেন এবং উৎসব পালন করেন। এটিই ছিল বাংলায় প্রথম বড়দিন উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

এরপর,১৭৭০-এর দশকে কলকাতার ওল্ড মিশন চার্চ এবং পরে ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল ব্রিটিশ ভারতে বড়দিন পালনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ব্রিটিশ অফিসার ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে ক্যাথিড্রালগুলিতে জমকালো মিডনাইট মাস এবং ক্যারল পরিবেশিত হতে শুরু করে।

উত্তরবঙ্গে বড়দিন পালনের ইতিহাস

উত্তরবঙ্গের বড়দিন পালনের ইতিহাস মূলত ঔপনিবেশিক প্রভাব, পাহাড়ি সংস্কৃতি এবং বাঙালির লোক-ঐতিহ্যের এক অনন্য মিশ্রণ।পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরবঙ্গের বড়দিনের উৎসবে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র পরিলক্ষিত হয়।

ব্রিটিশরা যখন দার্জিলিং ও কালিম্পংকে তাদের গ্রীষ্মকালীন আবাস এবং চা বাগানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে।তখন এই অঞ্চলে মিশনারিদের আনাগোনা শুরু হয়।পাহাড়ি অঞ্চলে মূলত নেপালি,ভুটিয়া ও লেপচা জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারিত হয়।এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও খ্রিস্টান রীতিনীতির সংমিশ্রণে এখানকার বড়দিন পেয়েছে পাহাড়ি রূপ।দার্জিলিংয়ের সেন্ট অ্যান্ড্রু’স চার্চ এবং কালিম্পং-এর প্রাচীন চার্চগুলি উত্তরবঙ্গে ক্রিসমাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।এই চার্চগুলিতে এখনও ইউরোপীয় ধাঁচের ক্যারল ও মিডনাইট মাস পালিত হয়।

কোচবিহার,জলপাইগুড়ি বা আলিপুরদুয়ারের মতো সমতলের অঞ্চলে বড়দিন পালন ভিন্ন ধাঁচের।এই জেলাগুলিতে অবস্থিত বহু প্রাচীন মিশনারি স্কুল ও কলেজ বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানে,নাটক ও ক্যারলের আয়োজন করে।এই প্রতিষ্ঠানগুলিই স্থানীয়দের মধ্যে বড়দিনকে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে সাহায্য করেছে।

সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও লোক-উৎসব

উত্তরবঙ্গের বড়দিন কেবল ধর্মীয় উৎসব না থেকে পাহাড়ি ও বাঙালি সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।পাহাড়ি খ্রিস্টানদের মধ্যে বড়দিনে একধরনের লোক-উৎসবের আমেজ দেখা যায়। এই সময়ে স্থানীয় খ্রিস্টান পরিবারগুলি ঐতিহ্যবাহী নেপালি পোশাক পরিধান করে, এবং তাদের উৎসবে নেপালি গান ও নৃত্য (যেমন মারুনি নাচ) যুক্ত হয়।

দার্জিলিংয়ের ম্যালে ও শিলিগুড়ির প্রধান বাজারগুলিতে বড়দিনের সময় ব্যাপক আলোকসজ্জা হয়। এখানকার বিভিন্ন বেকারি, বিশেষ করে শিলিগুড়িতে, এই সময়ে কেক ও পেস্ট্রির চাহিদা তুঙ্গে থাকে।

যেহেতু উত্তরবঙ্গ নেপাল, ভুটান এবং সিকিমের কাছাকাছি, তাই এই অঞ্চলগুলির সাংস্কৃতিক প্রভাবও বড়দিন উদযাপনে দেখা যায়। অনেক পর্যটক এই সময়ে শান্ত পরিবেশে বড়দিন পালনের জন্য এই অঞ্চলগুলিতে ভিড় করেন।

আরও পড়ুনঃ ঢাকা টু নয়াদিল্লি, আন্তর্জাতিক কল! কথা হল দুই সেনাপ্রধানের

একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপান্তর!

উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বড়দিন উৎসব ধীরে ধীরে বাংলার ‘বড় দিন’ রূপে কেবল ইউরোপীয়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।বরং তা  কলকাতার বাঙালি বাবু সংস্কৃতি ও সাধারণ জনজীবনে প্রবেশ করে।

ব্রিটিশদের অনুকরণে উনিশ শতকের ধনী বাঙালি ‘বাবু’ পরিবারগুলি বড়দিনের উৎসবে শামিল হতে শুরু করে।এই সময়ে বাঙালি বাড়িতে ‘বড় খানার’ (Bara Khana/Big Feast) প্রথা জনপ্রিয় হয়। এই ভোজসভায় ইউরোপীয় এবং বাঙালি খাবারের ফিউশন দেখা যেত।

বড়দিনের সঙ্গে কেক (Plum Cake) আদান-প্রদানের চল এই সময়েই শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে কলকাতার বেকারি শিল্পকে (যেমন নাহুম, ফ্লেইরিজ) প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।

পার্ক স্ট্রিট:বর্তমানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু

স্বাধীনতার পর, বড়দিনের উদযাপন কলকাতায় তার চূড়ান্ত সামাজিক রূপ লাভ করে, যার কেন্দ্রবিন্দু হয় পার্ক স্ট্রিট।বর্তমানে,এখন সেটাই মাদার টেরেসা সরণি।ডিসেম্বর মাস এলেই পার্ক স্ট্রিট ঝলমলে আলোয় সেজে ওঠে। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে এখানকার রেস্তোরাঁ ও নাইট ক্লাবগুলোতে বড়দিনের বিশেষ পার্টির আয়োজন শুরু হয়, যা শহরটির ‘সিটি অফ জয়’ পরিচিতিকে আরও জোরালো করে।

আধুনিক উৎসবের মেজাজ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিলিগুড়ি,যা উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার উৎসবের এক নতুন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে।বড়দিনে শহর জুড়ে পার্ক, মল ও ক্যাফেগুলিতে আধুনিক আলোকসজ্জা এবং বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।কলকাতার মতো এই পাহাড়ি এলাকাতেও,খ্রিস্টান ও অ-খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ই এই দিনটিকে,’বড়দিন’ বা ছুটির দিন হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালন করে।

বর্তমানে,পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতায় বড়দিন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষজন এই সময়টাতে পার্ক স্ট্রিটের আলোকসজ্জা দেখতে,কেক কিনতে এবং সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে ভিড় করেন।যা রাজ্যের সামাজিক সংহতির অন্যতম প্রতীক।পাশাপাশি সংক্ষেপে,উত্তরবঙ্গের বড়দিন উৎসব নিয়ে বলতে গেলে,এখানকার ঠান্ডা আবহাওয়া,পাহাড়ি চার্চের শান্ত পরিবেশ এবং বহু-সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এক বিশেষ ধরনের শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী রূপ ধারণ করেছে।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন