বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে মন্তব্যটি করেছেন, তা নিয়ে ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারত যদি ফেরত না দেয়, তাহলে সেটা নাকি “অবন্ধুসুলভ আচরণ” হবে—এই কথার ভেতরে যে স্পষ্ট হুমকির সুর আছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। কথাটা অনুরোধের মতো শোনায় না, বরং এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা মনে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা কি সত্যিই জানেন ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পরিণতি কোথায় গিয়ে থামতে পারে?

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন ব্যাখ্যা করতে গেলে প্রথমে দেশটিকে ভৌগোলিকভাবে বোঝা দরকার। দেশটি আকারে তামিলনাডুর মতো, মাত্র দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের একটু বেশি। চারদিকের অবস্থানও অদ্ভুত: তিনদিক ঘিরে ভারত, সামান্য অংশ মিয়ানমার, আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই ভূগোলের কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রাষ্ট্র। আর এই সম্পর্ক যদি শান্তিপূর্ণ হয়, তা হলে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নতি টেকসই থাকা খুব স্বাভাবিক ছিল। কারণ দেশটির জনসংখ্যা তরুণ, শিক্ষার হার আশ্চর্যজনকভাবে উঁচু, নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, আর দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতি ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে এগোচ্ছিল।
আরও পড়ুনঃ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অনুমোদন; জরুরি ভিত্তিতে রাশিয়া থেকে ৩০০টি এস-৪০০ মিসাইল কিনছে ভারত
কিন্তু গত এক বছরে দেশের দিকটাই বদলে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতি নষ্ট হয়েছে, মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে, আর সেনাবাহিনী–নির্ভর শাসন কাঠামো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যে দেশটি এক সময় মুসলিম বিশ্বের কাছে উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেটি ভুল দিকের দিকে মোড় নিচ্ছে।

এই অবস্থার মধ্যে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক হঠাৎ এত তলানিতে নামল কেন, তা বোঝার জন্য নির্ভরশীলতার বাস্তব চিত্র দেখতে হয়। বাংলাদেশের ভেতরের বাণিজ্যের বড় অংশ নদীপথে চলে, আর সেই নদীগুলো ভারত থেকেই নেমে আসে। নদীতে পানি না থাকলে দেশটির বিপুল অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা থমকে যাবে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও নির্ভরতা কম নয়; দেশের মোট বিদ্যুতের একটি বড় অংশ ভারত থেকেই সরবরাহ হয়, এবং সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আগের বছরে এই আমদানি বরং বাড়ছে। পোশাকশিল্প, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেই শিল্পে ব্যবহৃত তুলা ও সুতা প্রধানত ভারত থেকেই আসে। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যে সীমান্ত বাণিজ্য আছে, সেটাও ভারতের ভৌগোলিক অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। এমনকি আন্তর্জাতিক বিমানের রুটও ভারতের আকাশসীমা ছাড়া প্রায় অকার্যকর হয়ে যাবে।
এখানেই শেষ নয়। বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে কাজ করছে। তারা হঠাৎ ফিরে এলে বাংলাদেশের ভেতরেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ ভয়াবহ হয়ে উঠবে। cyclone warning থেকে satellite data পর্যন্ত প্রায় সবই ভারত দিয়ে পায় বাংলাদেশ, যা অন্য দেশ থেকে নেওয়া গেলেও খরচ ও সক্ষমতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
আরও পড়ুনঃ ভারত সফরের আগেই বন্ধু মোদীকে বড় অফার দিলেন পুতিন
এইসব বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব হঠাৎ করে ভারতবিরোধিতা বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের সেনা–অফিসারদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো, ভারতের মানচিত্র বিকৃত করা, “বৃহত্তর বাংলাদেশ” দেখানো, মৌলবাদীদের সামনে নত হওয়া—এসব পদক্ষেপ সম্পর্কে ভারতীয় কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এগুলো কোনো পরিণতি ভেবে করা সিদ্ধান্ত মনে হয় না।

ভারত এ অবস্থায় সংঘাতে যেতে চায় না। ভারতের কাছে স্থিতিশীল বাংলাদেশই সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশ শত্রুতার দিকে যাচ্ছে, তাহলে ভারতের হাতে যেসব প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক শক্তি আছে, সেগুলো প্রয়োগ করা ভারতের জন্য কঠিন নয়। এবং তা প্রয়োগ করা শুরু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি—যা ইতিমধ্যেই ত্রিশ ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নেমেছে—আরও গভীর সংকটে পড়ে যেতে পারে। বেকারত্ব বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রা কমছে, উৎপাদনশীলতা কমছে—এই সবকিছুর মধ্যেও সরকার পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, যা দেশের ভেতরে আরও অবিশ্বাস ও উত্তেজনা তৈরি করছে।

যে দেশের হাতে শিক্ষিত, তরুণ, উন্নয়নচিন্তায় অভ্যস্ত জনসংখ্যা আছে, সেই দেশ যদি মৌলবাদী রাজনীতির দিকে ঢলে পড়ে, তাহলে সেটা হবে উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নিজের হাতে ধ্বংস করা। ভারতের বিশ্লেষকরা স্পষ্ট বলছেন, ভারতের ইচ্ছা নয় বাংলাদেশকে কোনোভাবে চাপ দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া। বরং আশা করা যাচ্ছে, দেশটি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল নেতৃত্ব পাবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আবার আগের মতো স্বাভাবিক পথে ফিরবে।
বাংলাদেশ আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তা একদিকে বিপদজনক, অন্যদিকে সম্ভাবনায় ভরা। কোন পথে যাবে দেশ—এ সিদ্ধান্ত এখন বাংলাদেশের জনগণের। ভারত কোনোভাবেই চাইছে না সম্পর্ক ভয়ানক হয়ে ওঠুক। কিন্তু বাংলাদেশের নেতৃত্ব যদি ভুল দিক নেয়, তার মূল্য পড়বে বাংলাদেশকেই বহন করতে।









