বহু বছর ধরে দুবাই যেন সুসভ্য, সুসজ্জিত শহরের এক প্রতীক। অস্থির আরব দুনিয়ার মাঝখানে এক শান্তির উদাহরণ। চকচকে অট্টালিকার সারি, আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র, বিশ্বমানের বিমানবন্দর, পর্যটকদের স্বর্গ— সব মিলিয়ে এমন এক ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়েছে, দেখলে যেন মনে হয়, কোনও অশান্তি বা অনটন এই শহরকে স্পর্শ করতে পারে না।
সেই জন্যই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে রোজগার বা স্থিতিশীল জীবনযাত্রার আশায় দলে দলে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পাড়ি জমান সে দেশে। কারণ দুবাই মানেই যেন শান্তি ও আনন্দের একটা ছবি ভেসে ওঠে সাধারণ মানুষের চোখে।
আরও পড়ুনঃ কাঁদছে মুনির! রাওয়ালপিন্ডিতে নূর খান ঘাঁটিতে এবার ড্রোন হামলা তালিবানের
কিন্তু সম্প্রতি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব আয়াতোল্লা খামেনেই নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তেহরান যে প্রতিশোধ নেবে, তা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু সেই প্রতিক্রিয়া কেবল ইজরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এই ধারণা ভেঙে যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যে।
ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে উপসাগরীয় একাধিক দেশে। তার মধ্যেই ছিল আরব দুনিয়া এবং সেখানে সরাসরি আঘাতের মুখে পড়েছে দুবাই।
হামলার পরবর্তী দিনগুলোতে দুবাই ও সংলগ্ন দেশগুলির আকাশে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আটকানোও গেছে। কিছু প্রজেক্টাইল সমুদ্রে পড়লেও, কয়েকটি বেসামরিক এলাকায় আঘাত হানে— হোটেল, বন্দর এলাকা এবং বিমানবন্দরের আশপাশে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।
বাসিন্দা ও পর্যটকদের সূত্রের খবর, এত বছরের ইতিহাসে প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্রতটের বিলাসবহুল ক্লাব, উজ্জ্বল শপিং মল আর রাত্রিকালীন আলোর ঝলকানির শহরে বিস্ফোরণের শব্দ অনেকেই প্রথমে আতসবাজি ভেবেছিলেন। পরে জরুরি সতর্কবার্তা জারি হলে পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। বহু হোটেল অতিথিদের বাঙ্কার বা নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়।
যে শহর ‘অভেদ্য’ ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, সেই শহর হঠাৎ করেই যুদ্ধের বাস্তবতায় স্পর্শ পায়।
এই হামলার সরাসরি প্রভাব পড়ে দুবাইয়ের বিমান চলাচলে। উপসাগরীয় আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুবাইয়ের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে উড়ান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। একের পর এক আন্তর্জাতিক রুট বাতিল হয়। আপাতত ৬ মার্চ পর্যন্ত আকাশপথ বন্ধ বলেই ঘোষণা করা হয়েছে।
এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সংযোগের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে দুবাইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়েন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ শৃঙ্খলে বড়সড় বিঘ্ন ঘটে।
একটি আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক যাতায়াত ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে—তার স্পষ্ট উদাহরণ তৈরি হয়।
কেবল নিরাপত্তা নয়, আর্থিক ক্ষেত্রেও আঘাত এসেছে। উপসাগরীয় বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার পর সংযুক্ত আরব এমিরেটসের বড় স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত বাজার খোলা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন কর্তৃপক্ষ।
দুবাই যে নিজেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছিল, সেই আস্থার জায়গাতেও প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেয়। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি হঠাৎ করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
দুবাইয়ের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতের মতো দেশও— যেখানে মার্কিন সামরিক সম্পদ বা ঘাঁটি রয়েছে।
উপসাগর জুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে— প্রথমত, ইরানের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপ্তি বিস্তৃত; দ্বিতীয়ত, পুরো অঞ্চলই এই সংঘাতের সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন সরকার সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট, যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটগুলো হুমকির মুখে পড়বে।
আরও পড়ুনঃ শাহের হাত ধরে পদ্ম শিবিরে বাংলার নির্ভীক সাংবাদিক সন্তু পান
পারস্য উপসাগর ও আশপাশের সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক তেল পরিবহণের অন্যতম প্রধান রুট। এই অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হলে তার প্রভাব কেবল আঞ্চলিক থাকবে না। ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে।
দশকের পর দশক ধরে দুবাই এমন এক ধারণা তৈরি করেছে যে, তারা আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়ে দিল, মধ্যপ্রাচ্যের মতো পরস্পর-সংযুক্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনও বড় শহর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।
তবে একথাও ঠিক, দুবাইয়ের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুত পুনরুদ্ধার কৌশল এবং অর্থনৈতিক বিকল্প পরিকল্পনা নিশ্চয়ই পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করবে। শহরটি হয়তো দ্রুত স্বাভাবিকতায় ফিরবে।
কিন্তু এই কয়েকটি দিন যে বার্তা দিয়ে গেল, তা বেশ গভীর। উপসাগরের সবচেয়ে পরিপাটি ও সুরক্ষিত নগরও বৃহত্তর সংঘাতের ছায়া এড়াতে পারে না। কারণ দুবাই হয়তো এখনও অঞ্চলের অন্যতম নিরাপদ শহর, তবু ইরান সংকট প্রমাণ করে দিয়েছে, নিরাপত্তার ধারণা কখনও সম্পূর্ণ নয়। কারণ যুদ্ধের ঢেউ সীমান্ত মানে না।









