হাদির মৃত্যুর পর জ্বলছে বাংলাদেশ। মৌলবাদী দাপট, সংখ্যালঘু খুন, রাষ্ট্রযন্ত্রের অসহায়তা-সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি এখন ভয়ংকর বলেই মনে করছেন অনেকে। এই আবহে মুখ খুললেন দেশত্যাগী বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরাসরি আঙুল তুললেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের দিকে। তাঁর সাফ অভিযোগ, বাংলাদেশ আজ যে অরাজকতার পথে হাঁটছে, তার সম্পূর্ণ দায় ইউনুস সরকারেরই।
আরও পড়ুনঃ ‘হাসিনাই ভালো…’, সীমান্তে ওপার বাংলার মানুষের দীর্ঘশ্বাস
ভারতের জাতীয়স্থরের এক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদি-র মৃত্যু এবং সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হিংসা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমার নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছিল অরাজকতা বেড়ে যাওয়ায়, সেই অরাজক অবস্থাই হাদির মৃত্যুর জন্য দায়ি। ইউনুসের আমলে সেই অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। এখন বাংলাদেশে হিংসা তো রোজকার ঘটনা। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার সব কিছু অস্বীকার করছে, কারণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।”
শুধু দেশের ভিতরের পরিস্থিতিই নয়, ইউনুস জমানায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, “ইউনুস প্রশাসন লাগাতার ভারতবিরোধী বয়ান দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। চরমপন্থীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিদেশনীতি কার্যত ওরাই ঠিক করে দিচ্ছে।”
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতকে পরম বন্ধু মনে করেন। আজ নয় বহু দশক ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক। যা কোনও অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়েও বেশি স্থায়ী। সঠিক শাসনব্যবস্থা ফিরে এলে গত ১৫ বছরের বোঝাপড়া ও অংশীদারিত্ব আবারও ফিরবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
বাংলাদেশে বাড়তে থাকা মৌলবাদ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন হাসিনা। বলেন, “ইউনুস শাসনে মৌলবাদীদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। দোষী সাব্যস্ত সন্ত্রাসীরা জেল থেকে মুক্তি পাচ্ছে। জামাত-ই-ইসলামি-র উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।”
এখানেই থামেননি তিনি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তাঁর মত, শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার পক্ষে বড় হুমকি বাংলাদেশের এই অবস্থা।
আরও পড়ুনঃ কঠোর সিদ্ধান্ত নিল ভারত সরকার! এ দেশে ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল বাংলাদেশিদের
বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরবের হাসপাতালে মৃত্যু হয় ইনকিলাব মঞ্চ-র মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির। ওই দিন রাত থেকেই বাংলাদেশে হিংসা চরম আকার নিয়েছে। বিক্ষোভ, ভাঙচুর এবং হিংসার জেরে সংবাদ মাধ্যম বা ছায়ানটের মতো সংস্থাও আক্রান্ত।
এদিদকে, এই হিংসার জেরে পিটিয়ে মেরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সংখ্যালঘু হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে। ময়মনসিংহের মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা দীপু গত দু’বছর ধরে ভালুকার একটি কারখানায় কাজ করতেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ একদল বিক্ষোভকারী কারখানায় চড়াও হয়। ভাঙচুরের পর দীপুকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে এনে মারতে শুরু করে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। পরে দেহ ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় সড়কে নিয়ে গিয়ে গাছে বেঁধে আগুন ধরানো হয়। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকে রাস্তা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
দীপুকে কেন খুন করা হল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সূত্রের দাবি, ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ উঠেছিল। যদিও নিহতের পরিবার এই অভিযোগ মানতে নারাজ। সব মিলিয়ে, ইউনুস সরকারের অধীনে বাংলাদেশ যে গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, শেখ হাসিনার বক্তব্য সেই ছবিটাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরছে।
উত্তরবঙ্গের উদ্বেগ
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় শিলিগুড়ি থেকে দিনহাটা — উত্তরবঙ্গের মানুষের নজর সবসময়ই ওপারের দিকে। রাজনৈতিক মহলের মতে, হাসিনার এই ‘স্মার্ট মুভ’ আদতে ইউনূসের সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।









