“আর পাঁচ মিনিট… আর পাঁচ মিনিট পর আমি আর তোমাদের মধ্যে থাকব না। খুব কষ্ট করে মরছি।”
এই কথাগুলোই ছিল শেষ। ফোনের ওপারে আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রিয়জনদের শেষবারের মতো ডাকছিলেন ‘ওয়াও মোমো’-র কর্মীরা। আর ফোনের এপারে অসহায় হয়ে সেই কণ্ঠস্বর শুনে যাচ্ছিলেন পরিবারের মানুষ—জেনেও যে, তাঁরা আর কিছুই করতে পারবেন না।
কলকাতার আনন্দপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ‘ওয়াও মোমো’-র তিন কর্মী—ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা রবিশ হাঁসদা, বারুইপুরের বাসিন্দা বাসুদেব হালদার এবং গড়িয়ার পঙ্কজ হালদার। আগুন আর বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিলেন তাঁরা। সেই মুহূর্তে মোবাইল ফোনই ছিল তাঁদের শেষ আশ্রয়, শেষ সংযোগ।
গড়িয়ার বাসিন্দা পঙ্কজ হালদারের সঙ্গে সেই অভিশপ্ত রাতে দু’বার কথা হয়েছিল তাঁর স্ত্রীর। নিখোঁজ পঙ্কজের স্ত্রী মৌসুমী হালদার কাঁপা গলায় বলেন, “রাত তিনটের সময় ফোন করল। বলল—‘বাবাই, আমি বাঁচব না। এখানে আগুন ধরে গেছে, আমাকে বাঁচাও।’ তারপর ফোনটা কেটে গেল। আমি আবার ফোন করলাম। বললাম, যেভাবেই হোক বেরিয়ে আয়। ও বলল—‘আর পাঁচ মিনিট… তারপর আর থাকব না।’”
ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা রবিশ হাঁসদা কাজ করতেন ‘ওয়াও মোমো’-র গুদামে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে। ঘরে ছিল আড়াই মাসের দুধের সন্তান আর স্ত্রী। ঘটনার রাতে দাদাকে ফোন করেছিলেন রবিশ। সেই কান্নাভেজা কণ্ঠ আজও তাড়া করে ফেরে দাদা সুনীল হাঁসদাকে। তিনি বলেন, “ভোর তিনটে নাগাদ ফোন করে বলল—‘দাদা, আমি আজ মরছি। আমাদের কোম্পানিতে আগুন লেগেছে। খুব কষ্ট করে মরছি। আমার ছোট বাচ্চা আছে, বউ আছে—ওদের দেখিস দাদা।’ ও তখন কাঁদছিল।”
অগ্নিকাণ্ডের পরেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বারুইপুরের বাসিন্দা বাসুদেব হালদার। তাঁর ছেলে দয়াময় হালদার বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। তাঁর দাবি, “এগজিট গেট ছিল, কিন্তু সেখানে প্রচুর কাঠ-বাঁশ ফেলে পুরো গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তাই বাবা বেরোতে পারেনি। সামনের দিকের গেট দিয়ে বেরোনোর সুযোগও ছিল না।”
এই ঘটনার পর ‘ওয়াও মোমো’-র তরফে বিবৃতি দিয়ে দায় চাপানো হয়েছে পাশের গুদামের উপর। সংস্থার দাবি, সেখানে বিনা অনুমতিতে রান্না চলছিল, সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের গুদামে। কিন্তু নিহত ও নিখোঁজ কর্মীদের পরিবার প্রশ্ন তুলছে—আগুন কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, কেন নিরাপদ বেরোনোর পথ বন্ধ ছিল, কেন এতজন মানুষ ভিতরে আটকে পড়লেন।
রোজকার মতোই কাজে এসেছিলেন তাঁরা। রোজকার মতোই বাড়ির লোকেরা ভেবেছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর আবার দেখা হবে। কেউ ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে যাবে। আনন্দপুরের সেই গুদামের আগুন শুধু তিনটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি—ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে একাধিক পরিবার, অনাথ করে দিয়েছে শিশুদের, আর শহরের বুকে রেখে গেছে এক নিষ্ঠুর প্রশ্ন—কাজের জায়গায় মানুষের জীবন কি এতটাই অনিরাপদ?





