কয়েকদিন পরেই শুরু হতে চলেছে FIFA World Cup 2026। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া উৎসব, যার জন্য চার বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে কোটি কোটি মানুষ। অথচ এই আনন্দের মুহূর্তেই ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঢুকে পড়েছে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা—এ বার তারা আদৌ বিশ্বকাপ দেখতে পারবেন তো?
আরও পড়ুনঃ ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকে কলকাতার ফুটবল; ময়দানের ‘অচেনা হিরো’দের লড়াই!
খবরটা যেন শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, আরও অনেক গভীর কিছু ছুঁয়ে যাচ্ছে। এতদিন যেটা ছিল ঘরের উৎসব—পরিবার, বন্ধু, পাড়ার আড্ডায় রাত জেগে ম্যাচ দেখা—সেটাই যেন এ বার অধরা হয়ে উঠছে। কারণ, এখনও পর্যন্ত ভারতে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের কোনও নির্দিষ্ট সংস্থা চূড়ান্ত হয়নি। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FIFA বহু চেষ্টা করেও সম্প্রচারের স্বত্ব বিক্রি করতে পারেনি। প্রথমে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিপুল মূল্য ধার্য করা হয়েছিল।
পরে সেটি কমিয়ে প্রায় ৩৫ মিলিয়নে নামানো হয়। তবুও আগ্রহ দেখায়নি বড় কোনও মিডিয়া সংস্থা। এমনকি JioHotstar-এর ২৫ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এই অনীহা যেন শুধু সংখ্যার অঙ্ক নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাজারের কঠিন বাস্তবতা। কেন এমন হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর আর্থিক চাপ—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। তার উপর রয়েছে ক্রিকেটের প্রভাব। ভারতে ক্রিকেট শুধুই খেলা নয়, একপ্রকার আবেগ। গত কয়েক বছরে ক্রিকেট সম্প্রচারের স্বত্ব কিনতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে সংস্থাগুলি।
ফলে ফুটবলের জন্য আর সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না তারা। আরও একটি বড় কারণ সময়। এ বার বিশ্বকাপ আয়োজন হচ্ছে United States, Canada এবং Mexico-তে। এই তিন দেশের সময় ভারতের থেকে অনেকটাই আলাদা। ফলে বেশিরভাগ ম্যাচই হবে ভারতীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাত বা ভোরে। এই সময় দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় বিজ্ঞাপনদাতারাও আগ্রহ হারাচ্ছেন। আর বিজ্ঞাপন না থাকলে সম্প্রচার সংস্থার পক্ষে এত বড় বিনিয়োগ করা কঠিন।
আরও পড়ুনঃ ইতিহাস গড়ল NASA; সফল Artemis II মিশন
কিন্তু এই হিসেব-নিকেশের বাইরে রয়েছে এক বিশাল আবেগ। সেই ছেলেটা, যে প্রিয় দলের জার্সি পরে টিভির সামনে বসে থাকে; সেই বন্ধুরা, যারা রাত জেগে গোল হলে চিৎকার করে ওঠে; কিংবা সেই পরিবার, যারা একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপের গল্পে ডুবে যায়—তাদের কাছে বিশ্বকাপ শুধুই খেলা নয়, একটা অনুভূতি।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সময় এই দেশেই ফুটবলের উন্মাদনা নতুন করে দেখা গিয়েছিল। রাস্তাঘাটে পতাকা, ঘরে ঘরে তর্ক—মেসি না এমবাপে—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। এ বার সেই আবহ তৈরি হওয়ার আগেই যেন প্রশ্নচিহ্ন।
বিশ্বায়নের এই যুগে দাঁড়িয়ে যদি কোটি কোটি দর্শক নিজেদের প্রিয় খেলা দেখতে না পান, তা হলে সেটা শুধু বাজারের ব্যর্থতা নয়, আবেগেরও হার। এখন দেখার, শেষ মুহূর্তে কোনও সংস্থা এগিয়ে আসে কি না। কারণ, বিশ্বকাপ শুধু মাঠে খেলা হয় না—তা বেঁচে থাকে দর্শকদের হৃদয়ে।



