বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফের বড়সড় আলোড়ন। ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামির আমির ড. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছর একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, যা ওই কূটনীতিকের অনুরোধেই গোপন রাখা হয়েছিল। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পরে একক সরকার নয়, বরং “জাতীয় ঐকমত্যের সরকার” গঠনের কথা ভাবছে জামায়াত।
ড. শফিকুর রহমানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা সবার সঙ্গে খোলা মনে কথা বলতে চাই। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করার কোনও বিকল্প নেই।” তাঁর দাবি, অন্য দেশের কূটনীতিকরা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলে তা প্রকাশ্যেই হয়, কিন্তু ভারতীয় কূটনীতিক নিজেই বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন।
এই প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য না করলেও, ভারত সরকারের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে। অর্থাৎ, জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয় বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
সাক্ষাৎকারে ড. শফিকুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম বড় কারণ হল শেখ হাসিনার এখনও ভারতে অবস্থান। তাঁর মতে, এই বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, জামায়াত কোনও নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ভারত বা পাকিস্তান কোনও দেশের প্রতিই একতরফা অবস্থান নয়, বরং সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই জামায়াতের লক্ষ্য।
ঢাকার এক আবাসিক এলাকায় নিজের দফতর থেকে কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমির জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হলেও জামায়াত একা সরকার গঠন করতে চায় না। বরং একাধিক রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি “ন্যাশনাল কনসেনসাস গভর্নমেন্ট” বা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, “আমরা অন্তত পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র দেখতে চাই। যদি সব দল একমত হয়, তাহলে আমরা সবাই মিলে সরকার চালাতে পারি।” তাঁর মতে, দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে এই ধরনের সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. শফিকুর রহমান বলেন, যে দল সর্বাধিক আসন পাবে, প্রধানমন্ত্রীর পদ তাদেরই প্রাপ্য। তবে যদি জামায়াত একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেক্ষেত্রে দলই সিদ্ধান্ত নেবে তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হবেন কি না।
আরও পড়ুনঃ অবাঙালিরা নয় বাংলায় বাঙালিদের সম্মান দেয়নি স্বজাতিই
সম্প্রতি রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, জামায়াতের সঙ্গে জেন জি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি-র সম্ভাব্য জোট নিয়ে। রয়টার্সের উল্লেখ করা জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৭ বছর পর ভোটের রাজনীতিতে ফেরা জামায়াত নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে থাকতে পারে, যদিও বিএনপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে বলে অনুমান।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৩ সালে আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে দলটি ফের আইনি স্বীকৃতি পায়। তবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে নিয়ে জামায়াতের অস্বস্তিও প্রকাশ্যে এসেছে। ড. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামি লীগের সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কোনও রাষ্ট্রপতির অধীনে সরকারে থাকতে তারা স্বচ্ছন্দ বোধ করবে না।
সব মিলিয়ে, ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক, ঐক্য সরকার গঠনের প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে ভারসাম্যের বার্তা—এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।









