বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইরান, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের পোল্ট্রি শিল্পে। বিশেষ করে হায়দ্রাবাদ ও এর সংলগ্ন এলাকায় ডিমের বাজারে এক অভাবনীয় দরপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত কয়েক দিনে হায়দ্রাবাদে ডিমের দাম অবিশ্বাস্যভাবে কমে গিয়েছে, যা স্থানীয় খামারি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুনঃ যুদ্ধের আগুন এবার রান্নাঘরেও! দাম বাড়ছে ভোজ্যতেলের
তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ডিম রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই মূল্যহ্রাসের প্রধান কারণ। যুদ্ধের কারণে পশ্চিম এশিয়ার প্রধান প্রধান বন্দর এবং বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং স্বাভাবিক নৌ ও আকাশপথের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে তেলেঙ্গানা রাজ্য থেকে যে বিপুল পরিমাণ ডিম বিদেশে পাঠানো হতো, তা এখন স্থানীয় বাজারে এসে ভিড় করছে।
রপ্তানিযোগ্য ডিমগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে না পেরে স্থানীয় আড়তগুলোতে জমা হচ্ছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ডিমের দাম হু হু করে নামতে শুরু করেছে।
ন্যাশনাল এগ কো-অর্ডিনেশন কমিটির (NECC) তথ্যমতে, গত তিন দিনে ডিমের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে একটি ডিমের পাইকারি মূল্য কমে ৪.২০ টাকা থেকে কোথাও কোথাও ৩.৩০ টাকায় নেমে এসেছে।
সাধারণত গ্রীষ্মকালে ডিমের চাহিদা কিছুটা কম থাকে এবং দামও সামান্য কমে, যা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমানের এই দাম কমে যাওয়াকে পোল্ট্রি মালিকরা ‘অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এই অস্থিরতা মৌসুমী প্রভাবের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ভারত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত; বন্ধ নিউজ চ্যানেলের TRP
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার কারণে স্ট্রেট অফ হরমুজ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথগুলো এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজ ভাড়া এবং বিমা খরচও বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে লজিস্টিক চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পোল্ট্রি শিল্পের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো ভারতীয় ডিমের একটি বড় বাজার ছিল, যা বর্তমানে পুরোপুরি স্থবির।
হায়দ্রাবাদের পোল্ট্রি খামারিরা আশঙ্কা করছেন যে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক লোকসান গুনতে হবে। মুরগির খাবারের (Feed) দাম এমনিতেই চড়া, তার ওপর ডিমের উৎপাদন খরচ এবং বর্তমান বাজারমূল্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক তৈরি হয়েছে। ডিমের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে নিচে নেমে আসায় খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। অনেক ছোট ও মাঝারি খামার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ডিমের দাম কমে আসা কিছুটা স্বস্তির হলেও, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এটি একটি অশনি সংকেত। খুচরা বাজারে ডিমের হালি এখন অনেক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যদি দ্রুত রপ্তানি পথ পুনরায় চালু না হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা না প্রশমিত হয়, তবে ভারতের পোল্ট্রি খাত একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কেবল ভূ-রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ঢেউ এসে লেগেছে হায়দ্রাবাদের সাধারণ ডিমের বাজারেও। রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট এই কৃত্রিম উদ্বৃত্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে বিকল্প বাজার সন্ধান অথবা সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ব শান্তি এবং বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা না ফেরা পর্যন্ত হায়দ্রাবাদের এই পোল্ট্রি খাতের অনিশ্চয়তা দূর হওয়ার কোনো সহজ পথ দেখা যাচ্ছে না।









