১৯৪৭ সাল থেকে বাংলাদেশে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন, যা চরমে পৌঁছয় ১৯৫২সালে। সেই সময়, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য পথে নামেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা ৷ নির্বিচারে তাঁদের উপর গুলি চালায় পুলিশ। রক্তাক্ত হয় রাজপথ ৷ তারপর থেকে ভাষার জন্য শহিদদের স্মরণে এই দিনটি পালিত হয় ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে ৷ পরে মেলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ৷ ২০১০ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্রসংঘ।

বিশ্বভারতীতে উদযাপিত হল আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস। নতুন সরকার গঠনের পর ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী বিশ্বভারতীর উপাচার্য থেকে বাংলাদেশি পড়ুয়ারা ৷ দ্রুত পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের সংগ্রহশালা, জানান বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষ। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’ গানের মধ্য দিয়ে পদযাত্রা করেন অধ্যাপক-পড়ুয়ারা ৷
উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষ বলেন, “মাতৃভাষা দিবসে একটাই কথা বলব সব বিপন্নপ্রায় ভাষা বেঁচে থাকুক ৷ এটাই আমাদের অঙ্গীকার। আমাদের বিশ্বভারতীতে বহু ভাষাভাষীর পড়ুয়ারা পড়াশোনা করেন ৷ একসঙ্গে থাকেন ৷ বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। আশা করি, সুসম্পর্ক হবে। আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে হেরিটেজ ওয়াকের মতো বাংলাদেশ ভবনের মিউজিয়াম পর্যটকদের জন্য খুলে দেব ৷”
অন্যদিকে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদ আবুল বরকতের গ্রাম সালার থানার বাবলাতে শহীদ আবুল বরকত কেন্দ্রের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন ও আবুল বরকতের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদানের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হল। এদিনের কর্মসূচী তে সভাপতিত্ত্ব করেন শহীদ আবুল বরকত কেন্দ্রের সহ-সভাপতি গোলাম মওলা। সংক্ষেপে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য আলোচনা করেন সম্পাদক তুষার দে।

মাল্যদান করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ আবুল বরকত কেন্দ্রের সহ-সভাপতি তথা ভরতপুরের প্রাক্তন বিধায়ক ঈদ মহাম্মদ, কার্যকারী কমিটির সদস্য নওফেল মহা: সফিউল্লা সহ অন্যান্য সদস্য ও গ্রামের সাধারণ মানুষ। শহীদ আবুল বরকত কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয় আগামী বছর ঐতিহাসিক দিন টিকে বিশেষ মর্যাদার সাথে স্মরণ করতে স্মরণিকা প্রকাশ সহ বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
আর কলকাতায়, বাংলা পক্ষ কলকাতা জেলার উদ্যোগে বেলেঘাটা বিল্ডিং বাজার সংলগ্ন বিবেকানন্দ পার্কের নিকটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। সংগঠনের তরফে উপস্থিত ছিলেন বাংলা পক্ষর সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি, বাংলা পক্ষ কলকাতা জেলার সম্পাদক সৌম্য বেরা, কলকাতা জেলার সহ-সম্পাদক সুরজিৎ সেনগুপ্ত, কলকাতা জেলার দপ্তর-সম্পাদক সৌগত মজুমদার এবং সংগঠনের অন্যান্য সহযোদ্ধারা।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সাংগঠনিক সম্পাদক শ্রী কৌশিক মাইতির ভাষা স্মৃতিস্তম্ভে মাল্যদানের মাধ্যমে। তাঁকে অনুগমন করেন কলকাতা জেলা সম্পাদক শ্রী সৌম্য বেরা। পরবর্তীতে একে একে অন্যান্য সহযোদ্ধারা স্মৃতিফলকে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

এরপর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলা পক্ষর সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে জানান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলা পক্ষ গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বাংলা ভাষার পত্রে পরীক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা,
সর্বত্র বাংলায় পরিষেবা নিশ্চিত করা, এবং বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালিকে হেনস্তা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
এই দাবিগুলি নিয়ে PSC, স্কুল শিক্ষা দপ্তর, রেল, মেট্রো রেল ভবনসহ একাধিক সরকারি দপ্তরে জোরালো আন্দোলন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে কলকাতা জেলা সম্পাদক শ্রী সৌম্য বেরা স্বাধীন ভারতে বাঙালির ভাষাগত সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাষার কারণে আজও অন্য রাজ্যে গিয়ে বাঙালিদের হেনস্তা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভাষা আন্দোলনের ফলেই ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর মানভূমের একটি বৃহৎ অংশ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং তা আজকের পুরুলিয়া জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে ভাষা কেবল সংস্কৃতির বিষয় নয়—ভাষা মানুষের অধিকার, আত্মপরিচয় ও ভূখণ্ডগত ন্যায্যতার প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, এই ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে বাঙালি নিজের ভাষার দাবি তুলতে লজ্জা পায়। অথচ মানভূম আন্দোলন দেখিয়েছিল, মাতৃভাষার অধিকারের জন্য সংগ্রাম করলে রাষ্ট্রকাঠামো বদলাতেও বাধ্য হয়।
শ্রী বেরা জোর দিয়ে বলেন— “শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করলেই মাতৃভাষা রক্ষা হয় না। যতদিন না একজন মানুষ বাংলায় কথা বলে, বাংলায় কাজ করে, বাংলায় পরিষেবা নিয়ে বাংলার মাটিতে নিজের রুজি-রুটি উপার্জন করতে পারছে—ততদিন মাতৃভাষা দিবস পালন সার্থক হতে পারে না।”
তিনি জানান, ‘মাতৃভাষা বাঁচাও’ এই লড়াই ৩৬৫ দিনের, এবং বাংলা পক্ষ এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে যতদিন না বাঙালির মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কলকাতা জেলার সহ-সম্পাদক সুরজিৎ সেনগুপ্ত এবং কলকাতা জেলার দপ্তর সম্পাদক সৌগত মজুমদার, বাংলা পক্ষের সদস্য মৌসুমি মজুমদার ও ইফতিখার হোসেন, তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানান — মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে কাজের ভাষায় পরিণত করার দাবি শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ৩৬৫ দিন সর্বস্তরের বাঙালির সময়ের দাবি।
শেষে সংগঠনের তরফে জানানো হয়, বাংলা ভাষা ও বাঙালির মর্যাদা রক্ষার এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও সংগঠিতভাবে আগামী দিনেও চলবে।









