শুভজিৎ মিত্র,কলকাতাঃ
বড়দিন বা ক্রিসমাস (Christmas) বিশ্বজুড়ে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব হলেও,বিভিন্ন দেশে এর উদযাপন পদ্ধতি,ইতিহাস এবং তাৎপর্যের মধ্যে কিছু অনন্য বৈচিত্র্য দেখা যায়।আজকের প্রতিবেদনে,বিশ্বের কিছু অনন্য বড়দিনের ইতিহাস ও বর্তমানে পালিত প্রথাগুলি তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুনঃ ১৩ বছর পর সুরের জাদু ছড়াবেন; কলকাতায় এআর রহমান
১. ক্র্যাম্পাস- অস্ট্রিয়া এবং বাভারিয়া (জার্মানি)
প্রচলিত সান্তা ক্লজ (Saint Nicholas) যেমন ভালো শিশুদের উপহার দেন, তেমনই ক্র্যাম্পাস হলো সেন্ট নিকোলাসের শিংযুক্ত, রাক্ষুসে সঙ্গী। এটি একটি পৌত্তলিক (pagan) উৎস থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।ক্র্যাম্পাস মূলত খারাপ বা দুষ্টু শিশুদের শাস্তি দিতে আসে।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় “ক্র্যাম্পাসনাক্ট” বলা হয়।সেই রাতে অনেক অঞ্চলে ক্র্যাম্পাসের মুখোশ ও পোশাক পরে লোকেরা রাস্তায় নেমে আসে।যা,একটি ভীতিপ্রদ কিন্তু উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
২. লা বেফানা- ইতালি
ইতালির লোককাহিনী অনুসারে, লা বেফানা হলো এক বৃদ্ধা জাদুকরী, যিনি ৬ জানুয়ারি (Epiphany-এর রাতে) শিশুদের কাছে উপহার নিয়ে আসেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, তিনি শিশু যিশুকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন এবং পথ হারিয়ে ফেলেন। এর পর থেকে তিনি প্রতি বছর ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব শিশুর জন্য উপহার ও মিষ্টান্ন রেখে যান।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,শিশুরা মোজা ঝুলিয়ে রাখে। ভালো শিশুরা উপহার পায়।আর দুষ্টু শিশুদের জন্য রাখা হয় কয়লার মতো দেখতে কালো ক্যান্ডি।
৩. টিও দে নাদাল-কাতালোনিয়া,স্পেন
“টিও দে নাদাল-এর আক্ষরিক অর্থ হলো,”ক্রিসমাস লগ”।এটি একটি কাঠের গুঁড়ি, যা দুটি ছোট পা এবং একটি মুখের সাথে টুপি পরে সাজানো হয়। এর তাৎপর্য হলো উর্বরতা এবং শীতকালে বাড়ির তাপ বজায় রাখা।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,ক্রিসমাসের আগে শিশুরা এই কাঠের গুঁড়িটিকে খাওয়ায় এবং একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখে। ক্রিসমাস ইভে শিশুরা লাঠি দিয়ে গুঁড়িটিকে পিটিয়ে গান গায় এবং “উপহার”।মূলত,ছোট ক্যান্ডি ও খেলনা বের করে,প্রথাটি খুবই কৌতুকপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ চেনা কলকাতা আজ থেকে একটু হলেও অচেনা! ‘রাতারাতি’ আমূল বদলে যাবে শহর তিলোত্তমা
৪. কেএফসি ক্রিসমাস ডিনার-জাপান
জাপানে খ্রিস্টান জনসংখ্যা কম হলেও, এখানে বড়দিন একটি জনপ্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।১৯৭৪ সালে আমেরিকান ফাস্ট-ফুড চেইন KFC একটি সফল বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে,যার স্লোগান ছিল,”Kurisumasu ni wa kentakkii!“।এর মাধ্যমে,বড়দিনে টার্কির পরিবর্তে ভাজা মুরগি খাওয়ার একটি আধুনিক প্রথা চালু হয়।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,ক্রিসমাস ইভে জাপানের বহু মানুষ KFC-এর বিশেষ ক্রিসমাস প্যাকেজের জন্য আগে থেকে অর্ডার করে বা রেস্টুরেন্টের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়ায়। এটি জাপানি বড়দিনের একটি অনন্য প্রতীক।
৫. স্কেটিং টু চার্চ- কারাকাস,ভেনিজুয়েলা
বড়দিনের আগের দিনগুলোতে সকালে চার্চে যাওয়ার এই প্রথাটি কখন শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। এটি ধর্মীয় উপাসনা এবং সামাজিক আনন্দকে একত্রিত করে।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,ক্রিসমাসের আগের দিনগুলিতে কারাকাস শহরের রাস্তাগুলি গাড়ির জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে লোকেরা স্কেটিং করতে করতে সকালের প্রার্থনায়,যোগ দিতে পারে।এটি একটি মজাদার এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ঐতিহ্য।
৬. ক্রিসমাস স্পাইডার ওয়েব-ইউক্রেন
ইউক্রেনের লোককাহিনী অনুসারে, এক দরিদ্র বিধবা নারী তার সন্তানদের জন্য ক্রিসমাস ট্রি সাজাতে পারেননি। একটি মাকড়সা তার ক্রিসমাস ট্রি-তে পরের দিন সকালে রেশমের জাল বুনে দিয়েছিল, যা সূর্যের আলোতে সোনালী ও রূপালী হয়ে উঠেছিল। এর ফলে বিধবা ও তার সন্তানদের ভাগ্য ফিরে আসে। এটি সৌভাগ্য এবং প্রাচুর্যের প্রতীক।

বর্তমানে উদযাপিত হয়,ইউক্রেনীয়রা তাদের ক্রিসমাস ট্রি-তে উজ্জ্বল আলংকারিক মাকড়সার জাল এবং মাকড়সা ঝুলিয়ে দেয়।
বিশ্বের একমাত্র গ্রীষ্মকালীন বড়দিন
অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ায়,যখন উত্তর গোলার্ধে ২৫ ডিসেম্বর শীতকাল থাকে।তখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে ভরা গ্রীষ্মকাল।এই আবহাওয়াই অস্ট্রেলিয়ার বড়দিনকে অনন্যতা দান করেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় বড়দিন শুরু হয় ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী,১৭৮৮ সালের ডিসেম্বরে সিডনি কোভে প্রথম বড়দিন উদযাপিত হয়েছিল। রেভারেন্ড জনসন,গভর্নর আর্থার ফিলিপস এবং তার অফিসারদের জন্য পরিষেবা পরিচালনা করেন।যার পরে,তারা ক্রিসমাস ডিনার উপভোগ করেন।তবে, তখন উপনিবেশ স্থাপনকারী সাধারণ মানুষ এবং বন্দীদের কাছে এটি খুবই কঠিন একটি সময় ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার বড়দিন ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে বেশি একটি সামাজিক এবং পারিবারিক ছুটি হিসেবে পালিত হয়।যেখানে উপহার,আলো, এবং উষ্ণ আবহাওয়ার সাথে মিলিত হয়ে,এটি একটি বিশেষ আমেজ তৈরি করে।

তবে,২৫ ডিসেম্বরই যে যিশুর প্রকৃত জন্মদিন,সে বিষয়ে বাইবেলে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা নেই।ঐতিহাসিকদের মতে,রোমান সাম্রাজ্যে প্রচলিত শীতকালীন ফসল বা সূর্যের উৎসবকে খ্রিস্ট ধর্মে স্থান দেওয়ার,উদ্দেশ্যে এই দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।









