বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। সম্প্রতি এক শীর্ষস্থানীয় ইসরায়েলি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা পুরো বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তিনি ভারতকে ‘সুপারপাওয়ার’ (Superpower) বলতে নারাজ, বরং তার মতে ভারত হলো দুনিয়ার প্রথম আসল ‘কানেক্টর বা কানেক্টিং পাওয়ার’ (Connector or Connecting Power)!
কিন্তু এই ‘কানেক্টর বা কানেক্টিং পাওয়ার’ কথাটির আসল অর্থ কী? আর কেনই বা ভারতকে এই তকমা দেওয়া হলো? চলুন এ-টু-জেড (A to Z) সব জেনে নিই:
‘কানেক্টর বা কানেক্টিং পাওয়ার’ আসলে কী?
সহজ ভাষায়, সুপারপাওয়াররা সাধারণত সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির ভয় দেখিয়ে বিশ্ব শাসন করতে চায় (যেমন আমেরিকা বা চীন)। কিন্তু ‘কানেক্টর পাওয়ার’ হলো এমন একটি দেশ, যে বিশ্বের দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে সেতুবন্ধন বা ব্রিজ তৈরি করতে পারে। ভারত বর্তমানে ঠিক সেই কাজটিই করছে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক কেন এমন বললেন?
বর্তমান বিশ্বে অনেক বড় বড় সংকট চলছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন, ভারত আমেরিকা এবং রাশিয়া—উভয় দেশের সাথেই চমৎকার সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। আবার অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথেও তাদের দারুণ ব্যবসা বাণিজ্য। ভারত কারো শত্রু না হয়ে সবার সাথে ‘কানেকশন’ বা যোগাযোগ তৈরি করে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ও বাণিজ্যের এক বিশাল হাব (Hub) হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের এই নতুন রূপ:
সম্প্রতি জি-২০ (G20) সম্মেলন থেকে শুরু করে ব্রিকস (BRICS)—সব জায়গায় ভারত প্রমাণ করেছে যে তারা শুধু উন্নত দেশগুলোর নয়, বরং অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোরও (Global South) কণ্ঠস্বর। তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার কাজ করছে।
কেন এই বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ, ভবিষ্যৎ বিশ্ব কোনো একক সুপারপাওয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। বরং যে দেশ সবার সাথে সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখতে পারবে, তারাই বিশ্বে ছড়ি ঘোরাবে। আর এই জায়গাতেই ভারত সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকের এই কথাটিই প্রমাণ করে যে, ভারত এখন আর শুধু এশিয়ার বৃহৎ শক্তিই নয়, বরং পুরো বিশ্বের এক নির্ভরযোগ্য ‘বন্ধু’ বা ‘কানেক্টর’।
আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দিলাম নিচে:
1). আমেরিকা ও রাশিয়া দুই রাজনৈতিক মেরুতে অবস্থান করে, এবং একে অপরের শত্রু কিন্তু ভারত দুজনের সাথেই ব্যালেন্স সম্পর্ক মেনটেন করে। ভারতই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা আমেরিকার থেকে C17 গ্লোব মাস্টার, অ্যাপাচে অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার পাশাপাশি রাশিয়ার থেকে এস 500 ডিফেন্স সিস্টেম কিনতে পারে।
2). রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের চরম শত্রু এবং একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছে চার বছর ধরে। নিজেদের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ বন্ধ। কিন্তু ভারতের সাথে তাদের দুজনের সম্পর্ক রয়েছে। ভারত রাশিয়ার থেকে ক্রুড অয়েল কিনে তার থেকে রিফাইনড পেট্রোলিয়াম বানিয়ে ইউক্রেন কে বিক্রি করে। আবার ইউক্রেন থেকে গম কিনে আটা ভাঙিয়ে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করে। এই যুদ্ধের সময় ভারত রাশিয়া কে নাইট ভিশন ক্যামেরা, মিলিটারি বুট আর একে-47/ একে-56 বন্দুকের গুলি বানিয়ে রপ্তানি করেছিল তাদের ক্রাইসিসের জন্য ঠিক একইভাবে ইউক্রেন কে তাদের মিলিটারি গাড়িতে ফিটিং করার টায়ার রপ্তানি করেছিল। দুজনেই খুশি!
3). ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন একে অপরের শত্রু। দুজনেই দুজনকে শেষ করতে চায়। কিন্তু দুই দেশের সাথেই ভারতের দুর্দান্ত সম্পর্কের রসায়ন আছে। নিজেরা একে অপরের শত্রু হলেও, তারা দুই দেশই নরেন্দ্র মোদীকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান প্রদান করেছে। ভারত যেমন ইসরায়েলকে মিলিটারি ইকুইপমেন্টস পাঠায়, তেমনি প্যালেস্টাইন কে কোভিডের ভ্যাকসিন, ওষুধ, মেডিকেল সামগ্রী পাঠায়।
4). ইসরায়েল ও ইরান একে অপরের শত্রু। দুজনেই দুজনের সাথে যুদ্ধরত। কিন্তু দুই দেশের সাথেই ভারতের দুর্দান্ত সম্পর্কের রসায়ন আছে এবং সেটা ধর্মের নয়, প্রাচীন সভ্যতার সম্পর্ক। তারা নিজেরা একে অপরের শত্রু হলেও, তারা দুই দেশই নরেন্দ্র মোদীকে তাদের দেশের বন্ধু মনেকরে। ভারত যেমন ইসরায়েলকে মিলিটারি ইকুইপমেন্টস পাঠায়, গোলা গুলি রপ্তানি করে। তেমনি ইরানকে ব্যথার ওষুধ, কোভিড সহ বিভিন্ন ভ্যাকসিন, ওষুধ, মেডিকেল সামগ্রী, চাল, ভোজ্য তেল, মসলা রপ্তানি করে।
5). ইরান ও আমেরিকা একে অপরের শত্রু। দুজনেই দুজনকে শেষ করতে চায়। কিন্তু দুই দেশের সাথেই ভারতের দুর্দান্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। তারা নিজেরা একে অপরের শত্রু হলেও, তারা দুই দেশই ভারতকে তাদের দেশের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার মনে করে। ভারত যেমন ইরানকে কোভিডের ভ্যাকসিন, ওষুধ, মেডিকেল সামগ্রী, খাদ্য সামগ্রী, ভোজ্য তেল পাঠায় তেমনি আমেরিকা কে সফটওয়ার, ডায়মন্ড, চামড়ার সামগ্রী, মশলা, ক্রিটিক্যাল মিনারেল, হেভি মেশিন ইত্যাদি রপ্তানি করে।
6). একই ভাবে শিয়া ইরান ও সুন্নি আরব দুনিয়া একে অপরের চরম শত্রু। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে শেষ করতে চায় সেই ১৪০০ বছর ধরে। কিন্তু দুই দেশের সাথেই ভারতের দুর্দান্ত সম্পর্কের রসায়ন আছে। নিজেরা একে অপরের শত্রু হলেও, তারা দুই দেশই নরেন্দ্র মোদীকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান প্রদান করেছে। সৌদি আরব, আরব আমিরাত কে ভারত মিলিটারি ইকুইপমেন্টস পাঠায়, চাল, ডাল, সবজি, খাদ্য সামগ্রী, ভ্যাকসিন, ওষুধ, মেডিকেল সামগ্রী রপ্তানি করে তেমনি ইরানকে কে একই জিনিস রপ্তানি করে।
7). তেমনি আমেরিকা ও চীন একে অপরের প্রধান প্রতিযোগী এবং রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক শত্রু হলেও ভারতের সাথে তাদের দুই জনের কূটনৈতিক ও বানিজ্যিক সম্পর্ক বজায় আছে। কথাবার্তা আদানপ্রদান আছে।বড় মাপের বানিজ্য চুক্তিও আছে। ভারত যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে G-7 গোষ্ঠীর বৈঠকের অংশ তেমনি আমেরিকার শত্রু দুই দেশ রাশিয়া ও চীনের তৈরি ব্রিকস গোষ্ঠীর সভাপতি ভারত।
8). ঠিক একই ভাবে চিন ও জাপান একে অপরের শত্রু দেশ। কিন্তু ভারতের সাথে জাপানের ঘনিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক, কূটনীতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বহু শতাব্দীর পুরোনো সম্পর্ক যা আজও অটুট।
9). উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া একে অপরের চরম শত্রু দেশ। কিন্তু ভারতের সাথে তাদের পর্দার সামনে, পর্দার পিছনে দুই ভাবেই সম্পর্ক আছে। যাকে ব্যাক ডোর চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি বলে।
10). ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দুজনের সাথে দুজনের কুটনৈতিক সম্পর্ক ভালো না। তারা একে অপরের চরম প্রতিপক্ষ। কিন্তু তাদের সাথে ভারতের সু সম্পর্ক রয়েছে দীর্ঘকাল।
11). এসব ছাড়াও, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া, তাইওয়ান ও চীন, ভিয়েতনাম ও চীন, ফিলিপিন্স ও চীন, রাশিয়া ও পোল্যান্ড, ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড তারা একে অপরকে অপছন্দ করলেই, তাদের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক থাকলেও তাদের প্রত্যেকের সাথে ভারতের দারুণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক।
আরও পড়ুনঃ হরমুজে খেলছে ভারত! ২২,৪০০ মেট্রিক টন এলপিজি নিয়ে হরমুজ পেরিয়ে ভারতের দিকে জাগ বিক্রম
এরকম প্রতিটা দুই মেরু বা বিপরীত মেরুর শত্রু বা প্রতিপক্ষ দেশের সাথে, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার নিরিখে “কানেক্টর” তথা বন্ধু হিসেবে এক ও একমাত্র ভারতের যোগসূত্র সবথেকে শক্তিশালী ও দৃঢ়।।



