কলকাতার ময়দান শুধু একটা মাঠ নয়, এটা এক আবেগের নাম। এখানে জন্ম নেয় নায়ক, গড়ে ওঠে ইতিহাস। কিন্তু সেই আলো-ঝলমলে গল্পের আড়ালে থেকে যান কিছু মানুষ, যাঁরা এই ফুটবল সংস্কৃতির আসল ভিত্তি, গ্রাউন্ডসম্যান আর বলবয়রা। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজ শুরু হয়ে যায় কালিঘাট ক্লাবের গ্রাউন্ডসম্যান শম্ভু দাসের। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এই ক্লাবের একজন গ্রাউন্ডসম্যান। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে সেই মাঠ, যেখানে হাজারো দর্শক গলা ফাটিয়ে সমর্থন করেন প্রিয় দলকে।শম্ভু বলছিলেন, “আমাদের কাজটা কেউ দেখে না। ম্যাচের দিন সবাই প্লেয়ারদের দেখে, কিন্তু মাঠটা ঠিকঠাক না থাকলে তো খেলা হবেই না। বৃষ্টি হলে অনেক সময় রাত জেগে কাজ করতে হয়। তখন ক্লান্ত লাগে, কিন্তু পরের দিন যখন দেখি ম্যাচ ভালোভাবে হচ্ছে, তখন খুব ভালো লাগে।”
আরও পড়ুনঃ ‘মুখ্যমন্ত্রী একজন রেজিস্টার্ড লায়ার’; বললেন শুভেন্দু
তাঁর কথায় স্পষ্ট, এই কাজ শুধু দায়িত্ব নয়, ভালোবাসা। সীমিত বেতন, অনিশ্চয়তা, সব কিছু সত্ত্বেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। কারণ, ফুটবল তাঁর জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে। আবার যুবভারতী মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট্ট সায়ন, বয়স মাত্র ১৪। সে একজন বলবয়। ম্যাচের সময় বল মাঠের বাইরে গেলেই ছুটে গিয়ে তুলে আনে, আবার দ্রুত খেলায় ফিরিয়ে দেয়। সায়নের চোখে স্বপ্ন, আর মুখে লাজুক হাসি। সে বলল, “আমি ছোট থেকেই যুবভারতী আসি। আগে শুধু খেলা দেখতাম, এখন বলবয় হিসেবে থাকতে পারছি। খুব ভালো লাগে। একদিন আমিও এখানে খেলতে চাই, বড় প্লেয়ার হতে চাই।” তার কাছে এই দায়িত্ব শুধু কাজ নয়, এক বড় সুযোগ। কাছ থেকে খেলোয়াড়দের দেখা, মাঠের উত্তেজনা অনুভব করা, সবই তাকে স্বপ্ন দেখায়। মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গল-এর বড় ম্যাচে যখন গ্যালারি উত্তাল হয়ে ওঠে, তখন শম্ভু আর সায়নের মতো মানুষরাই নীরবে নিজেদের কাজ করে যান। তাঁদের জন্যই খেলার ছন্দ অটুট থাকে।
আরও পড়ুনঃ রাজ্য যেন কমিশনের নজরবন্দি ‘দুর্গে’ পরিণত; ১০০ শতাংশ বুথই স্পর্শকাতর
তবুও তাঁদের জীবন সহজ নয়। শম্ভুর সংসার চলে কষ্টে, সায়নের পড়াশোনা আর স্বপ্নের লড়াই, সব মিলিয়ে প্রতিদিনই এক নতুন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তবুও তাঁরা থেমে যান না। কারণ, ফুটবল তাঁদের কাছে শুধুই খেলা নয়, একটা বেঁচে থাকার কারণ। ম্যাচ শেষে আলো নিভে গেলে, দর্শকরা বাড়ি ফিরে গেলে, তখনও এই মানুষগুলোই থেকে যান মাঠে। পরের দিনের প্রস্তুতি নিতে আবার শুরু হয় তাঁদের কাজ। কোনও ক্যামেরা তাঁদের খোঁজ রাখে না, কোনও শিরোনামে তাঁদের নাম ওঠে না। তবুও সত্যিটা একটাই, ময়দানের এই ‘অচেনা হিরো’দের ছাড়া ফুটবল অসম্পূর্ণ। তাঁদের ঘাম, তাঁদের স্বপ্ন আর তাঁদের ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকে কলকাতার ফুটবল।



