লিওনেল মেসির সফর ঘিরে যে উৎসবের আবহ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা মুহূর্তে রূপ নেয় চরম বিশৃঙ্খলায়। শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় স্টেডিয়াম চত্বর। এই ঘটনায় মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে আগেই গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। রবিবার তাঁকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। শনিবারই বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

শতদ্রু আইনজীবীর মাধ্যমে বলেন, ‘‘আমার অতীতে যা খ্যাতি ছিল, তা নষ্ট হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একাধিক আইনের ধারা (পিডিপিপি, এমপিও) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কে দোষ করেছে? আমি কোনও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করিনি।’’ শতদ্রুর বিরুদ্ধে এমপিও (মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার) আইনে মামলা রুজু হয়েছে। আদালতে সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবী। তাঁর সওয়াল, ‘‘আমি কী করেছি, যে এই আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে?’’
আরও পড়ুনঃ ‘ভিআইপিদের ভিড়েই ঢেকে গেলেন মেসি’, ক্ষোভ উগরে দিলেন বাইচুং ভুটিয়া
তার পরেই শতদ্রু আইনজীবী দ্যুতিময় ভট্টাচার্যের মাধ্যমে আদালতে বলেন, ‘‘আমি এক জনকে নিয়ে এসেছি, যিনি শিক্ষা দেবেন। বাচ্চাদের দেখাবেন। স্টেডিয়ামে কী হয়েছে, তার জন্য আমার বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে? ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজত কেন চাওয়া হচ্ছে?’’ জামিন যদি না হয়, তা হলে হেফাজতের দিন সংখ্যা কমানো হোক বলে আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
যুবভারতী-কাণ্ডে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক ধারায় শতদ্রু দত্ত-সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯২, ৩২৪ (৪)(৫), ৩২৬ (৫), ১৩২, ১২১ (১), ১২১ (২), ৪৫ এবং ৪৬ ধারা। অন্যদিকে এদিন যখন আদালতে শতদ্রুকে তোলা হচ্ছে, সেই সময় বাইরে থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়। এমনকী জুতো হাতে বিক্ষোভ দেখানো হয়। যা নিয়ে আদালতের বাইরে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে হিংসায় উস্কানি, আঘাত, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং সরকারি কর্মীদের হেনস্থা। পাশাপাশি, এমপিও আইন ও পিডিপিপি আইনের অধীনেও পৃথক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পেছনে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী, তাঁদের ভূমিকাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। তিনি প্রকাশ্যেই উদ্যোক্তাদের দায়ী করেন। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব ও মুখ্যসচিবও রয়েছেন।
রবিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে পৌঁছান তদন্ত কমিটির সদস্যরা। স্টেডিয়ামে স্পোর্টস দফতরের সচিবও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি আয়োজকদের ভূমিকা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ‘মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা উচিত ছিল’, মেসি কাণ্ডে দিদির গ্রেফতারি চেয়ে বেলাগাম মামা
শনিবারের ঘটনার বিবরণ রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। সকাল প্রায় ১১টা ৩০ মিনিট নাগাদ যুবভারতীতে মেসির গাড়ি প্রবেশ করে। প্রিয় তারকা ফুটবলারকে এক ঝলক দেখতে দর্শকদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। কিন্তু অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ দর্শকদের মেসির সামনে যেতে দেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক নেতা ও বিশেষ অতিথিরাই তাঁকে ঘিরে রাখেন। এই পরিস্থিতিতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শকরা।
প্রথমে গ্যালারি থেকে জলের বোতল ছোড়া শুরু হয়। এরপর হ্যান্ডিং, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ। এক পর্যায়ে দর্শকদের একাংশ চেয়ার ও গেট ভাঙার চেষ্টা করে। ব্যারিকেড ভেঙে বহু মানুষ মাঠের ভিতরে ঢুকে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা হিমশিম খেতে থাকেন। গোটা স্টেডিয়াম কার্যত লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

এই ঘটনার পর রাজ্যের ক্রীড়া আয়োজন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সেলিব্রিটি ইভেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ও পুলিশের তদন্তে আগামী দিনে কী তথ্য সামনে আসে, তার দিকেই তাকিয়ে রাজ্য। একদিকে যেমন দর্শকদের ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলার কারণ খোঁজা হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে আয়োজকদের দায় ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ঘাটতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যুবভারতী-কাণ্ড এখন শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্টের ব্যর্থতা নয়, বরং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।









