গচ্ছিত আমানত ভাঙতে গৃহস্থের মন কাঁদে। সেই আমানত যদি দিনের পর দিন ক্ষমতার স্বাদ দেয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। তাই আমানত বাঁচাতে হবে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক হাতছাড়া করা চলবে না। এটাই এখন তৃণমূলের মূল লক্ষ্য। ভোটব্যাঙ্কে আমানতের অঙ্ক ঠিক রাখতে সিপিএমের ও বাম শরিকের সংখ্যালঘু ভোটে নজর দিয়েছে তৃণমূল। যার বড় উদাহরণ হচ্ছে প্রতীক উর রহমান।
আরও পড়ুনঃ উদ্বিগ্ন কমিশন, কমিশনের ‘ইন্টারনাল চ্যাট’ অভিষেকের হাতে এল কী করে!
সিপিএমের ছাত্র সংগঠনের শীর্ষস্তরের নেতা প্রতীক উর রহমান। গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী ছিলেন। বছর দুয়েকের মধ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দলের বিরুদ্ধে। ইস্তফার ইচ্ছাপ্রকাশ করে রাজ্য সম্পাদককে চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠি এখন ভাইরাল। এরপর থেকেই প্রতীক উরের তৃণমূল-যোগের জল্পনা জোরাল হয়েছে। ঘাসফুলের একটা বড় অংশ ধরেই নিয়েছে যে ছাব্বিশের ভোটে তৃণমূলের প্রতীকে লড়বেন প্রতীক উর। তাঁর সঙ্গে আরও এক সিপিএম নেতার নামেও একই গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তিনিও গত লোকসভা ভোটে সিপিএমের প্রার্থী ছিলেন।
দ্বিতীয় ব্যক্তির চেয়ে এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতিতে বেশি আলোচিত প্রতীক উর। যার বড় কারণ তাঁর ধর্মীয় পরিচয়। এই সিপিএম নেতার মাধ্যমে কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারলেও তৃণমূলের লাভ। সেই অঙ্ক কষেই কী এগোচ্ছে কালীঘাট-ক্যামাক স্ট্রিট? এই জল্পনা জোরাল হচ্ছে আরও কয়েকজন সিপিএম নেতা-নেত্রীর কীর্তিতে। বাকি বাম শরিকদের (CPI, RSP, FB) একটা অংশের নেতারা। এর মধ্যে অবশ্যই শাসনের মজিদ মাস্টার। সাম্প্রতিক অতীতে তিনি সরাসরি তৃণমূলের পক্ষে সওয়াল করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইকেও কুর্নিশ জানিয়েছেন। এই সবের মধ্যেই বামেদের সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের দিকে ঝোঁকার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।
এই পরিস্থিতিতে খেলা ঘোরালেন দলের রাজ্য সম্পাদক। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে জোট নিয়ে বৈঠক করলেন। সিপিএমের ক্ষমতালোভীরা সমর্থন করলেও একাংশ গোঁড়া হল নীতির প্রশ্নে। এ বিষয়টিকেই অস্ত্র করে আসরে নামে তৃণমূল। এরই মাঝে বাংলাদেশের এক জামাত নেতাকে আক্রমণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন সিপিএমের দীপ্সিতা ধর। এতে উষ্মা প্রকাশ করেন আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি। আর সুর চড়ান জিম নওয়াজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “দীপ্সিতা ধরের শূন্যতার ফ্রাস্ট্রেশন থেকে উঠে আসা শব্দচয়ন ধরার বিশেষ দরকার মনে করছি না। কিন্তু একটি বিভ্রান্তিকর নিউজকে হাতিয়ার করে ফেসবুকে করা পোস্ট তিনি ১৪ ঘণ্টা নির্লজ্জের মতো নিজের ওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন। আপনি জামাতের রাজনীতির হাজারো সমালোচনা করুন, সেই অধিকার আপনার আছে। কিন্তু বিভ্রান্তিকর নিউজ প্রচারের অধিকার আপনার নেই। জামাতের আমীর শফিকুর রহমান হারেননি। তিনি তাঁর বুথে ৫ ভোটে পিছিয়ে থাকলেও নিকটতম বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বীকে ২১ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছেন। শেষ কথা, বাংলাদেশ জামাতের আমীরের বহু বক্তব্য আমি শুনেছি। অত্যন্ত নম্র, সভ্য এবং অসাম্প্রদায়িক। তাঁর বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, ব্রাহ্মণ্যবাদী সিপিএমের চেয়ে জামাতের আমীর বহুগুণ বেশি অসাম্প্রদায়িক। আমার এই পর্যবেক্ষণে কারও জ্বালা ধরলে সেই দায়িত্ব আমার নয়।”
এই ক্রোনোলজিতে যেন ইঙ্গিত স্পষ্ট। সিপিএমের একাংশ যেন উঠেপড়ে লেগেছে যাতে সংখ্যালঘুদের ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে যায়। এরই অঙ্গ প্রতীক উরের চিঠি ভাইরাল করা? কারণ, চিঠিটা লিখেছে কে? প্রতীক উর রহমান। লিখেছে কাকে? তাঁর দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে? তাহলে ওই পদত্যাগপত্র ভাইরাল হওয়ার দায় কার? এই দু’জনের যে কোনও একজনের।
এবার প্রতীক উর যে রকম লো-প্রোফাইলের, তাঁর পক্ষে এই চিঠি ভাইরাল করা সম্ভব নয়। তাহলে প্রতীক উরের মতো লো-প্রোফাইল নেতা নিয়ে আলোচনা কেন? প্রতীক উরের নাম অনুকূল হলে ওই রকম লো-প্রোফাইল নেতা নিয়ে আলোচনাই হত না। নামটা প্রতীক উর রহমান বলেই এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বহু হিন্দু নেতা সিপিএম থেকে তৃণমূল-বিজেপিতে গেছেন, তা নিয়ে আলোচনাই হয়নি। এর কারণ কী?
হুমায়ুনের জন্য মুসলিম ভোট কিছুটা তৃণমূলের কমতে পারে। তার পরে যদি সিপিএমের এক-আধ শতাংশ মুসলিম ভোট চলে যায়, তাহলে তৃণমূলের বিপদ। তাই সিপিএমকে হিন্দুত্ববাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী দল বলে দেগে দেওয়া? কিংবা মুসলিমরা সিপিএমে ব্রাত্য—এই রকম প্রচার চালিয়ে যাতে কোনও ভোট সিপিএমের দিকে না যায়, তার ব্যবস্থা করার জন্যই কি প্রতীক উর রহমানের পদত্যাগপত্র ভাইরাল করে দেওয়া?
মজিদ মাস্টারের বক্তব্য, জিম নওয়াজের অহেতুক দীপ্সিতাকে আক্রমণ, দীপ্সিতার প্রতি আক্রমণ নিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় সুরসুরি দেওয়া, প্রতীক উরের পদত্যাগপত্র—এই প্রত্যেকটি বিন্দু যোগ করলেই পুরো ছবি আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।









