এই সময়টা পৌষমাসের মধ্যভাগ। আমাদের তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃপূজক সভ্যতায় এই মাস একাধারে লক্ষ্মীপূজার মাস, অন্যদিকে পৌষকালী দর্শনের মাস। বাঙালির মাতৃকার দুই আপাত ভিন্ন রূপের এ এক আশ্চর্য একীভবন। এই সময় গঙ্গারিডির বাঙালি শস্যদায়িনী মাতৃকার পূজা করতো, যিনি হাতে জোড়া মাছ ধারণ করেন। সেই জোড়া মাছের প্রতীক সম্ভবত শ্রীবৎস চিহ্নের মধ্যে আজও বিদ্যমান।
আরও পড়ুনঃ অবাঙালিরা নয় বাংলায় বাঙালিদের সম্মান দেয়নি স্বজাতিই
মুর্শিদাবাদের বহরমপুর সংলগ্ন বিষ্ণুপুরের মা করুণাময়ী কালীর বিগ্রহ। প্রতি বছর পৌষমাসে এখানে একমাস ধরে মেলা চলে। অগণিত মানুষ আসেন করুণাময়ীর করুণা লাভ করে ধন্য হতে।আজও মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূম অঞ্চলের মানুষের কাছে বিষ্ণুপুর কালীবাড়ি প্রধানতম কালীক্ষেত্রগুলির একটি।
মা করুণাময়ী বিগ্রহ এবং তাঁর ইতিহাস বড়ো বিচিত্র। জনশ্রুতি অনুযায়ী ইনি দাক্ষিণাত্যের কোনো রাজার উপাস্য মাতৃকা ছিলেন। যবন আক্রমণের সময় মায়ের বিগ্রহ জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। তারপর নানা ঘটনা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে সেই মাতৃমূর্তি এসে পৌঁছায় বিষ্ণুপুরের সুবিশাল বিলে; যেটি গঙ্গার এক অত্যন্ত প্রাচীন প্রবাহের শেষ চিহ্ন।
এই অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদটি মুর্শিদাবাদের এক বিশাল অঞ্চলের জীবনযাত্রার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত এবং একাধিক প্রাচীন জনপদ, বাণিজ্যকেন্দ্র ও তন্ত্রপীঠ এই বিলের চারিধারে আজও আছে। অষ্টাদশ শতকে কৃষ্ণেন্দ্র( মতান্তরে কৃষ্ণচন্দ্র) হোতা নামে এক তন্ত্রসাধক এই অঞ্চলে থাকতেন এবং নবাব সরফরাজ খাঁর প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করতেন। আর কাজের পর প্রতিদিন এই বিষ্ণুপুরের বিলের তীরের মহাশ্মশানে সাধনা করতেন। তাঁর মেয়ে করুণাময়ী এই বিলের জলে রহস্যজনকভাবে অন্তর্হিত হয়ে গেলে তার অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাধক এই মাতৃমূর্তি অর্ধপ্রোথিত অবস্থায় খুঁজে পান। মা আজও সেইভাবে পূজিত হচ্ছেন। বিষ্ণুপুরের বিল সেই থেকে হোতাসাগর নামে পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের এক মহামারীর সময়ে মাতৃ আদেশে মহাসাধক বামাক্ষ্যাপা এখানে এসে মা করুণাময়ীর সাধনার ধারাটির পুনরুদ্ধার করেছিলেন বলেও জানা যায়।
আরও পড়ুনঃ শিকড় বিচ্ছিন্ন বাঙালি; বাঙালিয়ানা কি তবে বিবর্তনের পথে!
করুণাময়ী কালী কষ্টিপাথরের বিগ্রহ। তিনি চতুর্ভুজা, লোলরসনা, মুণ্ডমালিনী। মূর্তির নির্মাণশৈলীতে আদি মধ্যযুগের প্রাচীনত্বের ছাপ স্পষ্ট। মাতৃবিগ্রহ কোমর পর্যন্ত দেখা যায়। তার নিচের অংশ ভূগর্ভে প্রোথিত। দীর্ঘদিন ধরে এখানে তন্ত্রসাধনার ধারা বিদ্যমান ছিল। মন্দির সংলগ্ন মহাশ্মশান মুখরিত হতো সাধক সোনাঠাকুর এবং সমতুল্য অন্যান্য সাধকদের মাতৃনামগানে:
জাগো গো মা কুণ্ডলিনী মূলাধার নিবাসিনী
নিত্যানন্দস্বরূপিণী ছাড়ো ব্রহ্মগ্রন্থিদ্বার….
স্বাধিষ্ঠান মণিপুর অনাহত বিশুদ্ধায়
ললনাজ্ঞা ভেদি মন পিত্তসোম স্নেহাধার
মিলিয়ে পরমে এবে কুলকুণ্ডলিনী তবে
শোভি কেন্দ্র সহস্রারে হও মাগো একাকার
কখনও ধ্বনিত হতো মহাসাধক নাটোররাজ রামকৃষ্ণের পদ:
মন যদি যায় ভুলে
তবে বালির শয্যায় কালীর নাম দিও কর্ণমূলে
কিম্বা
ভবে সেই সে পরমানন্দ
যে জন পরমানন্দময়ীরে জানে
সে না যায় তীর্থ পর্যটনে
কালী ছাড়া কিছু শোনে না কানে
আমাদের মা স্বয়ং কল্পলতা স্বরূপিনী। তিনি লক্ষ্মী রূপে সমৃদ্ধি দান করেন, আবার তিনিই কালী রূপে কৈবল্য দান করে দুঃখচক্র থেকে উদ্ধার করেন। বাঙালির নিজস্ব বৈশাখী নববর্ষ তো বটেই, পাশ্চাত্য সভ্যতার এই নববর্ষও অজান্তেই এখানে মাতৃপূজার ধারার সাথে আশ্চর্য সঙ্গতি রক্ষা করছে। আর তার জন্য আমাদের যীশুপূজা বা কোনো পথভ্রষ্ট গুরুভজা সম্প্রদায়ের গুরুর কাল্পনিক মাহাত্ম্যের প্রয়োজন পড়ে না। শুধু মাতৃনামেই আমাদের সমস্ত মঙ্গল সাধিত হয়। সাধক রামপ্রসাদের ভাষায়:
চতুর্বর্গ করতলে ভাবিয়ে রে এলোকেশী









