সামনেই বিধানসভা নির্বাচন । ভোট যুদ্ধের প্রস্তুতি তুঙ্গে । কিন্তু এই ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে দলের অলস বা নিষ্ক্রিয় নেতারা যদি ভাবেন যে তাঁরা নেতৃত্বের নজরের আড়ালে চলে যাবেন, তবে তাঁরা ‘মূর্খের স্বর্গে’ বাস করছেন । যে সমস্ত জনপ্রতিনিধি বা দলীয় পদাধিকারী ‘গা ছাড়া’ মনোভাব নিয়ে চলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এবার চরম কঠোর অবস্থান নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস ।
দলের অন্দরে স্পষ্ট বার্তা, ভোটের ডামাডোলের মাঝেও পারফরম্যান্সের আতশকাঁচ থেকে রেহাই মিলবে না কারও । বরং অকর্মণ্যতা বা দলের ক্ষতি করছে এমন নিষ্ক্রিয়তা নজরে এলেই সংগঠনে চালানো হবে শুদ্ধিকরণ অভিযান, যাকে রাজনৈতিক মহল একপ্রকার ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলেই মনে করছে ।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব বিন্দুমাত্র ফাঁক রাখতে নারাজ । দলের এক শীর্ষ নেতৃত্বের কথায়, “নির্বাচনের আগে 24 ঘণ্টাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আমাদের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় । শীর্ষ নেতৃত্ব যখন দিনরাত এক করে কাজ করছেন, তখন নিচুতলার নেতা-কর্মীদের একাংশের গাফিলতি বা শৈথিল্য দলের কাঙ্ক্ষিত ফল আনার ক্ষেত্রে বড়সড় পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াচ্ছে । সেই জায়গা থেকেই এই কড়া বার্তা দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ।”
বস্তুত, তৃণমূলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে গতিতে কাজ হচ্ছে, নিচুতলার অনেক নেতাই সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছেন । আর এই ব্যর্থতাকে আর প্রশ্রয় দেবে না শাসকদল । সম্প্রতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভার্চুয়াল বৈঠকে দলের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন । সেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, দলে নিষ্ক্রিয়তার কোনও জায়গা নেই । এতদিন যাঁরা পদ আঁকড়ে বসে থেকেও কাজ করেননি, তাঁদের এবার জবাবদিহি করতে হবে । অভিষেকের বার্তা, “এর পরেও কেউ নিষ্ক্রিয় থাকলে দল ব্যবস্থা নেবে । কারণ এই নিষ্ক্রিয়তা দলের ক্ষতি করছে ।”
অর্থাৎ, ভোটের মুখে সবাইকে ব্যস্ত রাখার অছিলায় অকর্মণ্যদের আড়াল করার রেওয়াজ এবার বন্ধ হতে চলেছে । তৃণমূল ভবনের কাছে খবর এসেছে, কলকাতা থেকে জেলা-সর্বত্রই দলের বেশ কিছু নেতা, সাংসদ এবং বিধায়ক মনে করছেন বিধানসভা ভোট এমনিতেই পার হয়ে যাওয়া যাবে । তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা, এখন কষ্ট করে ময়দানে না নামলেও চলবে, নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার পর প্রচারে মুখ দেখালেই কাজ হবে । এই ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ বা নিশ্চিত জয়ের আত্মতুষ্টিই এখন দলের মাথাব্যথার কারণ ।
তৃণমূলের রাজ্যস্তরের এক নেতা জানিয়েছেন, কয়েকজন জনপ্রতিনিধি চেয়ার পেয়ে নিজেদের সর্বেসর্বা ভাবছেন । কিন্তু দলের ঘোষিত অবস্থান হলো, আগামী তিন থেকে চার মাস দলের জন্য মরণপণ লড়াইয়ের সময় । এই সময়ে যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিশ্রম করবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা ।
আরও পড়ুনঃ “আমি সেই মেয়ে”! এসআইআর আবহে মৃতদের পরিবার নিয়ে দিল্লি সফর করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তের খবর রাখছেন । পাশাপাশি দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC) গ্রাউন্ড রিপোর্ট সংগ্রহ করছে । জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের যে ‘হোম টাস্ক’ দেওয়া হচ্ছে, তা পালন হচ্ছে কি না, তার রিপোর্ট প্রতিদিন জমা পড়ছে । অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দিয়েছেন, বিধানসভা ভিত্তিক যে ‘ওয়ার রুম’ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে প্রতিদিনের কাজের রিপোর্ট রাজ্য নেতৃত্বের কাছে পাঠাতে হবে । অর্থাৎ, ফাঁকি দেওয়ার আর কোনও রাস্তা খোলা নেই ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের শাসকদলের কাছে অস্তিত্ব ও অধিকার বজায় রাখার লড়াই । লোকসভায় সরকার গঠন হলেও, রাজ্যের শাসনভার কাদের হাতে থাকবে তা ঠিক হয় বিধানসভা ভোটেই । তাই বিরোধী শূন্য করে বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে মরিয়া তৃণমূল । সেখানে দলের ভিতরের আগাছা বা নিষ্ক্রিয় অংশকে ছেঁটে ফেলে সংগঠনকে আরও ধারালো করতেই এই কড়া দাওয়াই । আগামিদিনে যাঁরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন না, তাঁদের রাজনৈতিক কেরিয়ার প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং দলের এই অভ্যন্তরীণ ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর শিকার হতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে ।









