ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ আমেরিকার দাদাগিরির প্রথম ঘটনা নয়, যেমনটি বিবিসি বিশ্বাস করাতে চাইছে, বরং এর আগেও আমেরিকা একটি দেশের শাসককে অপহরণ করেছে। পানামার প্রেসিডেন্ট মানুয়েল নরিয়েগাকে। যাকে একসময় আমেরিকার মিত্র মনে করা হতো কিন্তু পরে তিনি ওয়াশিংটনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান।
মানুয়েল নরিয়েগা শুরুতে আমেরিকার সমর্থন পেয়েছিলেন এবং ১৯৮০-এর দশকে পানামায় আমেরিকান স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। নরিয়েগার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং মাদক পাচারের অভিযোগ আসতে শুরু করে, সাথে আমেরিকার এও উদ্বেগ ছিল যে নরিয়েগা পানামা খালের আশেপাশে নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি আরও বাড়তে থাকে এবং অবশেষে ১৯৮৯ সালের শেষদিকে আমেরিকান সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে নরিয়েগাকে সরিয়ে ফেলা জরুরি, যদিও তিনি একসময় আমেরিকার মিত্র ছিলেন।
আরও পড়ুনঃ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু? পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ!
২০ ডিসেম্বর ১৯৮৯-এ প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (বাবা) পানামায় সামরিক আক্রমণের নির্দেশ দেন। এই অপারেশনের নাম রাখা হয়: “জাস্ট কজ” (Operation Just Cause)। আমেরিকানরা অভিশপ্ত নামও খুব দারুণ রাখে। যেমন জাপানে ফেলা অ্যাটম বোমার নাম হিরোশিমায়: বোমার নাম লিটল বয় রাখা হয়েছিল। খুব নিরীহ বাচ্চা!! যাই হোক, আমেরিকা ২৬ হাজারের বেশি সৈন্য পানামায় পাঠায়। অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল নরিয়েগার ক্ষমতা শেষ করা এবং আমেরিকান স্বার্থ রক্ষা করা। নরিয়েগার সমর্থক এবং বিরোধী উভয়ের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। পানামার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, সামরিক ঘাঁটি এবং নরিয়েগার ব্যক্তিগত রক্ষীদের ওপর আক্রমণ করা হয়।
এই সামরিক হস্তক্ষেপের পর নরিয়েগাকে অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
নরিয়েগার বিরুদ্ধে আমেরিকান আদালতে মামলা চলে, যেখানে তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডের ভিত্তি ছিল মাদক পাচার, দুর্নীতি এবং আমেরিকান আইন লঙ্ঘন। এই রায় আমেরিকার পক্ষ থেকে এটা প্রমাণ করে যে একসময়ের মিত্র নেতাও যদি ওয়াশিংটনের স্বার্থের বিরুদ্ধে যান, তাহলে তাদের শক্তি প্রয়োগ করে সরিয়ে ফেলা যায়।
২০১০ সালে নরিয়েগাকে ফ্রান্সে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি এবং অপহরণের অভিযোগে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এক বছর পর, ২০১১ সালে, তাকে পানামায় ফিরিয়ে নেওয়া হয় যাতে তিনি তিনটি ভিন্ন মামলায় মোট বিশ বছরের কারাদণ্ড পূর্ণ করেন।
তাছাড়া ইরাক এবং লিবিয়াতেও অনুরুপ কর্ম কান্ড করেছে আমেরিকা ।
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)
১৯৮০-এর দশকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকার প্রিয় মিত্র। কিন্তু কুয়েত আক্রমণ ও তেল নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে শত্রুতে পরিণত। ২০০৩ সালে মিথ্যা “গণবিধ্বংসী অস্ত্র” অজুহাতে আক্রমণ, গর্ত থেকে ধরে ইরাকি আদালতে ফাঁসি। ফলাফল: ইরাক আজও অস্থির।
আরও পড়ুনঃ ‘রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে…’ ভেনেজুয়েলা আবহে ভারতকে বড় হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
মুয়াম্মার গাদ্দাফি (লিবিয়া)
২০০৩-এর পর পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন, তেলের বড় বাজার খুলে দেন। কিন্তু ২০১১-এ আরব স্প্রিং-এর সময় নিজের দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাইলে নেটোর (আমেরিকা-ফ্রান্স-ব্রিটেনের নেতৃত্বে) মাসের পর মাস বোমা হামলা। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের হাতে নৃশংসভাবে হত্যা। লিবিয়া আজ ধ্বংসস্তূপ, দাস বাজার আর জঙ্গি গোষ্ঠীর আখড়া।
আমেরিকার জন্য মিত্র এবং শত্রুর সংজ্ঞা সাময়িক এবং স্বার্থভিত্তিক। কোনো শক্তিশালী নেতাও যদি আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে যান, তাহলে তাদের সরাতে সামরিক অভিযান চালানো যায়। আন্তর্জাতিক আইন জুতোর ডগায়।









