রবিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই আফগানিস্তান সীমান্তে বড়সড় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। পাকিস্তানের দাবি, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-র ঘাঁটিগুলিকেই লক্ষ্য করে এই এয়ারস্ট্রাইক করা হয়েছে। পাক সেনার তরফে জানানো হয়েছে, এই হামলায় টিটিপির কয়েক ডজন জঙ্গি নিহত হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই বিমান হামলার একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তবে আফগান সংবাদমাধ্যমের দাবি, পাকিস্তানের এই হামলায় একটি মাদ্রসা ধ্বংস হয়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খবর অনুযায়ী, আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশের বারমাল ও উরগুন জেলা, পাশাপাশি নানগারহার প্রদেশের খোগ্যানি, বেহসুদ এবং গনিখেল জেলায় এই হামলা চালানো হয়। আফগান সূত্রের দাবি, এই এয়ারস্ট্রাইকে অন্তত ১৯ জন সাধারণ আফগান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
এই হামলার নেপথ্যে প্রতিশোধের তত্ত্বও সামনে আসছে। মনে করা হচ্ছে, শনিবার পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে টিটিপির আত্মঘাতী হামলার জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওই দিন গোয়েন্দা অভিযানের সময় টিটিপি জঙ্গিরা আত্মঘাতী হামলা চালায়, যাতে পাকিস্তানের দুই নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান এই বিমান হামলা চালায়।
তালিবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লা মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তান তাদের সীমা লঙ্ঘন করে আফগানিস্তানের নিরীহ নাগরিকদের উপর হামলা চালিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘পাক সেনা আরও এক বার আফগানিস্তানের ভিতরে ঢুকে হামলা চালিয়েছে। শনিবার রাতে নাঙ্গরহার এবং পক্তিকা প্রদেশে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এই হামলা মহিলা এবং শিশু-সহ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তানের সরকার এই ধরনের হামলা চালিয়ে নিজের দেশের অক্ষমতাকে ঢাকার চেষ্টা করছে।’’
তালিবান প্রশাসনের এক সূত্রের দাবি, এই হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা সুনিশ্চিত করার কাজ শুরু হয়েছে। তবে এই হামলার জবাব যে সময়মতো দেওয়া হবে, তালিবান প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা সেই ইঙ্গিতও দিয়েছেন বলে ওই সূত্রের দাবি। পাকিস্তানের এই হামলার পরই তালিবান প্রশাসনের কর্তারা জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক ডেকেছেন। মনে করা হচ্ছে, রণকৌশল ঠিক করতেই এই বৈঠক। তবে ওই সূত্রের দাবি, হামলার জবাব যে দেওয়া হবে সেই ইঙ্গিত দিলেও এখনই তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না তালিবান প্রশাসন। তবে এই হামলাকে ঘিরে দু’দেশের সীমান্তে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল টিটিপি। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালিবান টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং সেই জঙ্গিরাই পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে তালিবানের অভিযোগ, পাকিস্তান সরকার ও সেনা ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি সংগঠনকে মদত দিচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তানে চরম দারিদ্র্যে ৭ কোটি মানুষ, ২৭ বছরে আয় বৈষম্য সর্বোচ্চ
তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান গঠিত হয় ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, বাইতুল্লাহ মেহসুদের নেতৃত্বে। পাকিস্তানের ফেডারেল শাসিত উপজাতি এলাকার বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে একত্র করে এই সংগঠন তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মহলে টিটিপিকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল-কায়েদার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা অভিযানের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই সংগঠনের জন্ম। বর্তমানে তাদের মূল লক্ষ্য পাকিস্তানের সরকারকে সরিয়ে নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী একটি ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করা।
এই উত্তেজনার আবহেই ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর মধ্যরাতে কাবুলের পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। এর পর আফগানিস্তানের তরফে পাক সীমান্তের সেনা আউটপোস্টে পালটা হামলা চালানো হয়। তালিবানের দাবি ছিল, ওই হামলায় পাকিস্তানের ৫৮ জন সেনা নিহত হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের সেনা জানায়, তাদের ২৩ জন জওয়ানের মৃত্যু হয়েছে।
এর পর ১৪ অক্টোবর রাতে ফের পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হয়, যাতে অন্তত ১৫ জন আফগান নাগরিক এবং পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনীর ৬ জন সদস্য নিহত হন। পরে নভেম্বরের শুরুতে আফগানিস্তানের স্পিন বলডক এলাকাতেও পাকিস্তানের তরফে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই এবার আফগান সীমান্তের কাছে টিটিপি ঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন করে বিমান হামলা চালাল পাকিস্তান, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।









