কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
‘চিকেন নেক’ থেকে ‘এলিফ্যান্ট নেক’-এর দিকে যাত্রা শুরু করার সময় এসেছে। বিখ্যাত আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরু জগ্গি বাসুদেব সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে দেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। তিনি শিলিগুড়ি করিডরকে ‘৭৮ বছরের পুরনো অসঙ্গতি’ বলে উল্লেখ করেছেন, যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় সংশোধন করা উচিত ছিল।
আরও পড়ুনঃ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক! রাজাবাজারে যুবক খুনের কিনারা করে ফেলল কলকাতা পুলিশ
বর্তমানে যখন দেশের সার্বভৌমত্বের উপর খোলাখুলি হুমকি আসছে, তখন এই ‘চিকেন নেক’-কে পুষ্ট করে ‘এলিফ্যান্ট নেক’-এ পরিণত করার সময় এসেছে এমনই বলেছেন সদগুরু। তাঁর এই বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গে গভীর চিন্তাভাবনা জাগিয়েছে। শিলিগুড়ি করিডর, যাকে ‘চিকেন নেক’ বলা হয়, ভারতের মানচিত্রে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই সরু ভূখণ্ডটি মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার চওড়া এবং প্রায় ৬০ কিলোমিটার লম্বা।
এটিই ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ,অসম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং সিকিমের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত করে। এখান দিয়ে যায় রেললাইন, জাতীয় সড়ক, পাইপলাইন এবং অন্যান্য পরিকাঠামো, যা পঞ্চাশ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবনধারণ এবং সামরিক চলাচলের জন্য অপরিহার্য। এই করিডরের চারপাশে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চীনের চুম্বি ভ্যালির কাছাকাছি অবস্থান যা এটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের তাড়াহুড়ো করে আঁকা সীমান্তরেখা এই অসঙ্গতির জন্ম দেয়। পূর্ব বঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়ায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অনেকে মনে করেছিলেন যে এই সুযোগে করিডরটি প্রসারিত করা যেতে পারে, কিন্তু তা হয়নি। সদগুরু ঠিক এই প্রসঙ্গই তুলে ধরেছেন ১৯৭১-এ সংশোধন না হওয়া একটি ভুল, যার ফল এখন ভুগতে হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ সম্পর্ক ছেদ মাফুজের! তীব্র বিদ্রোহ বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টিতে
বর্তমানে হুমকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের কিছু কট্টরপন্থী নেতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় করিডরটি কেটে উত্তর-পূর্বকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিচ্ছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমশ ঘনিষ্ঠতা, লালমনিরহাট এয়ারবেসের পুনরুজ্জীবন এবং সম্ভাব্য ইউরোফাইটার জেট কেনার খবর ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তো স্পষ্টভাবে বলেছেন যে কূটনীতি বা বলপ্রয়োগে হলেও করিডরটি ২০-২২ কিলোমিটার প্রসারিত করতে হবে।ভারত সরকার অবশ্য নিষ্ক্রিয় নয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে সিলিগুড়ি করিডরের আশেপাশে তিনটি নতুন সামরিক ঘাঁটি চালু করা হয়েছে অসমের ধুবড়ির কাছে লাচিত বরফুকন মিলিটারি স্টেশন, বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ায় ফরওয়ার্ড বেস।
এছাড়া রাফাল জেটের স্কোয়াড্রন হাসিমারায় মোতায়েন, এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেমের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিকল্প রুট যেমন কালাদান মাল্টিমোডাল করিডরের মাধ্যমে মায়ানমার হয়ে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। এগুলো করিডরের নিরাপত্তা জোরদার করছে।









