বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে নজিরবিহীন এক অন্ধকার রাতের সাক্ষী থাকল দেশ। মৌলবাদী তাণ্ডব ও সহিংস হামলার জেরে দেশের দুই শীর্ষ জাতীয় দৈনিক—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার—শুক্রবার ছাপা সংস্করণ প্রকাশ করতে পারল না। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় পত্রিকা দু’টির অনলাইন কার্যক্রমও প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। অনেকেই একে বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করছেন।
আরও পড়ুনঃ ISI-এর নীল নকশায় জ্বলছে বাংলাদেশ! আক্রান্ত মিডিয়া থেকে ভারতীয় দূতাবাস
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের শীর্ষ কর্মকর্তারা আলাদা আলাদাভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করেই পত্রিকা দু’টির অফিস লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ব্যাপক ভাঙচুরের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগও করে। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে কর্মরত সকল সাংবাদিক, সম্পাদকীয় কর্মী ও ছাপাখানার শ্রমিকদের দ্রুত অফিস ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, এই আকস্মিক ও সহিংস হামলার ফলে অফিসের সার্বিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ, সার্ভার, ছাপাখানা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আজ শুক্রবার পত্রিকা ছাপা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ডিজিটাল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অনলাইন সংস্করণও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা লক্ষ লক্ষ পাঠক একদিনের জন্য হলেও এই দুটি কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১২টার দিকে কয়েকশ’ বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রথমে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। এরপর তারা দ্য ডেইলি স্টারের দিকেও এগিয়ে যায়। হামলাকারীরা স্লোগান দিতে দিতে কাচ ভাঙে, আসবাবপত্র তছনছ করে এবং একাধিক স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই সময় দুই পত্রিকার অনেক সাংবাদিক ও কর্মী ভবনের ভেতরেই আটকা পড়ে যান। চারদিকে ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তাঁদের প্রাণ সংশয় তৈরি হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে হামলাকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন এবং ভবনের ভেতরে আটকে পড়া সাংবাদিক ও কর্মীদের নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকাজ শেষ হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক।
তবে এই ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের একাধিক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকরভাবে হামলাকারীদের ঠেকাতে এগিয়ে যাননি। এক সাংবাদিক বলেন, “পুলিশ চেয়ে চেয়ে দেখেছে। তারা হামলাকারীদের থামাতে যায়নি।” এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ?
অন্যদিকে, তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্যশৈন্যু মারমা ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি এর আগে বিবিসি বাংলা-কে জানান, পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর মতে, হামলাকারীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শুরুতে সমস্যা হলেও পরে অতিরিক্ত বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও বিজিবির উপস্থিতিও দেখা যায়।
এই হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাতে শুরু করেছে। অনেকের মতে, এটি শুধু দুটি পত্রিকার উপর হামলা নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত।
সব মিলিয়ে, এই বর্বর হামলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও মুক্ত সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার, এই ঘটনার পর রাষ্ট্র কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করে এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেয়।









