বিশেষ প্রতিবেদন:
প্রাচীন মিশরের রাজতন্ত্র, ফারাওদের রহস্যময় সমাধি এবং পিরামিডের আনাচকানাচ নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কৌতূহলের শেষ নেই। ইতিহাসের বহুমাত্রিক খনি হিসেবে পরিচিত মিশরের বুকে এবার প্রকাশ্যে এল রাজতন্ত্রের গোড়ার দিকের নরবলির এক চাঞ্চল্যকর ও অন্ধকার অধ্যায়। সাম্প্রতিক এক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মিশরের প্রথম রাজবংশের আমলে ফারাও বা রাজার মৃত্যুর পর পরকালে তাঁর সেবা ও অনুগত্য নিশ্চিত করতে শত শত অনুচরকে নরবিলি দিয়ে সমাধিস্থ করা হতো।
আরও পড়ুনঃ দুর্গাপুজোর ভিড়ে স্করপিওর তাণ্ডব, আতঙ্কে পথচারীরা!
ফ্লিন্ডার্স পেট্রির অসমাপ্ত কাজ ও আধুনিক ফরেন্সিক প্রযুক্তি
মিশরের প্রথম রাজবংশের (First Dynasty) ফারাওরা শাসন করেছিলেন আনুমানিক ৩০৭৮ থেকে ২৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। বর্তমান আবিদোস শহরের উম এল-কাব নামক প্রত্নস্থলে ১৯২০-র দশকে প্রথম খননকার্য পরিচালনা করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ফ্লিন্ডার্স পেট্রি। সেই সময় তিনি রাজাদের মূল সমাধির চতুর্দিকে অসংখ্য মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলেন। একাধিক ক্ষেত্রে একটিমাত্র রাজার সমাধির চারপাশ ঘিরে ছিল শত শত মানুষের কঙ্কাল। পেট্রি সেই সময়েই নরবলির অনুমান করলেও কোনো শক্ত ফরেন্সিক প্রমাণ না থাকায় তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
সম্প্রতি আমেরিকার পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক রোজ়েলিন ক্যাম্পবেল পেট্রির সংগৃহীত সেই কঙ্কাল ও মাথার খুলিগুলির ওপর আধুনিক ফরেন্সিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তাঁর এই যুগান্তকারী গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিয়োলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে, যা পেট্রির নরবলির তত্ত্বকে বহুগুণ জোরালো করে তুলেছে।
মাথার খুলিতে মারাত্মক আঘাত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ
উনবিংশ শতাব্দীতে ফ্লিন্ডার্স পেট্রি মিশর থেকে ৪৬টি মানুষের মাথার খুলি সংরক্ষণ করে ব্রিটেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্যাম্পবেল আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ওই ৪৬টি খুলি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, তার মধ্যে অন্তত ১৮টি খুলিতে মারাত্মক ধরনের আঘাত ও ক্ষতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে।
ক্যাম্পবেলের মূল দাবি অনুযায়ী, অধিকাংশ খুলির ওপর আড়াআড়ি ফাটল ধরা পড়েছে, যা ভারী ও চ্যাপ্টা কোনো বস্তু দিয়ে সজোরে আঘাতের ফলে তৈরি হয়। এ ছাড়া কয়েকটি খুলিতে ধারালো অস্ত্রের কোপ, চোখের ওপর ও মাথার পাশে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা নির্দেশ করে যে, ওই ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঠিক আগে প্রচণ্ড মানসিক আতঙ্ক ও শারীরিকভাবে বলপ্রয়োগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করে হত্যা করাই ছিল এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য।
আরও পড়ুনঃ ফ্রান্সে বাড়ছে অশান্তি; প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য নির্দেশিকা জারি করল নয়াদিল্লি
কখন ও কাদের বলির শিকার বানানো হতো?
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রাজার সমাধির চারপাশে প্রাপ্ত দেহাবশেষগুলি তৎকালীন প্রাচীন মিশরীয় সমাজের তুলনামূলক নিম্ন বা মধ্যস্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও অনুচরদের। সেখানে ফারাওর সমকক্ষ বা রাজপরিবারের কোনো সদস্যের দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি। বেশ কিছু কবরের গায়ে মৃতের নাম ও সামাজিক পদবি খোদাই করা ছিল, যা থেকে তাঁদের পরিচয় স্পষ্ট হয়।
প্রাচীন মিশরীয় ধর্মে বিশ্বাস করা হতো যে, মৃত্যুর পর মানুষ এক ভিন্ন জগতে পুনর্জন্ম লাভ করে। তাই পরকালে রাজার আরাম ও সেবা নিশ্চিত করতে তাঁর প্রিয় অনুচর ও দাস-দাসীদের বলির শিকার বানানো হতো। অনুচরদের কবরের ভেতরে মাটির পাত্র, তামার নানা সরঞ্জাম ও ছোট হাতির দাঁতের মূর্তিও উদ্ধার করা হয়েছে।
ক্যাম্পবেলের মতে, কিছু অনুচর হয়তো পরকালে অমরত্ব ও সম্মান লাভের আশায় স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দিতেন, আবার অনেককে বলপূর্বক হত্যা করে রাজার সাথে সমাধিস্থ করা হতো। প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশের ইতিহাস এবং তৎকালীন সামাজিক কাঠামোর এই নৃশংস দিকটি নিয়ে আগামী দিনে আরও বড় মাপের ফরেন্সিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।


