ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নির্বাচন কমিশন একটি স্বতন্ত্র এবং শক্তিশালী স্তম্ভ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের যে সংঘাত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, তা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ১১ দফা কড়া পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, বাংলায় নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিচারবিভাগকে এখন সরাসরি ময়দানে নামতে হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ কলকাতার আদলে ‘বিল্ডিং ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের উদ্যোগ শিলিগুড়িতে
১. নজিরবিহীন বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ: কেন এই কঠোরতা?
সাধারণত ভোটার তালিকা সংশোধন বা নির্বাচনের প্রশাসনিক কাজ নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সরাসরি তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট জাজ (DJ) এবং অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জাজ (ADJ) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের এই কাজে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
* তাৎপর্য: এর অর্থ হলো, রাজ্য প্রশাসনের ওপর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আর কোনো ভরসা নেই। আমলাতন্ত্র যখন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারে পরিণত হয়, তখনই বিচারবিভাগকে এমন ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ সামাল দিতে ‘অসাধারণ ব্যবস্থা’ নিতে হয়।
২. পশ্চিমবঙ্গ বনাম অন্যান্য রাজ্য: প্রশাসনিক সংঘাতের তুলনামূলক চিত্র
ভারতের অন্যান্য বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলোর (যেমন তামিলনাড়ু, কেরালা বা কর্ণাটক) দিকে তাকালে দেখা যায়, কেন্দ্রের সাথে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা নির্বাচন কমিশনের রুটিন কাজে সেখানে এমন অচলাবস্থা তৈরি হয় না।
* সহযোগিতার অভাব: বাংলায় ডিএসপি থেকে ডিএম—সবাইকে ‘ডিমড ডেপুটেশন’-এ হাইকোর্টের নির্দেশে কাজ করতে হবে। অন্যান্য রাজ্যে যেখানে নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দেয়, সেখানে বাংলায় আদালতকে ‘গার্ডিয়ান’ হিসেবে বসাতে হচ্ছে।
* ডিজিপি-র ভূমিকা: রাজ্যের পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের অসন্তোষ এবং ব্যক্তিগত হলফনামা (Personal Affidavit) তলব করা অত্যন্ত বিরল। এটি প্রমাণ করে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবিধানের বদলে শাসকের প্রতি বেশি অনুগত হয়ে পড়েছে।
৩. মমতার সরকারের সামনে ‘এগারোটি ধাক্কা’ ও তার প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— “ভোটার তালিকা স্বচ্ছ না হলে নির্বাচন হবে না।” এটি রাজ্য সরকারের জন্য সবথেকে বড় চপেটাঘাত। সরকারের রণকৌশল ছিল সময়ক্ষেপণ করে নির্বাচন পার করে দেওয়া, কিন্তু আদালতের নির্দেশ সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ২৭০ জন নির্বাচনী আধিকারিককে শোকজ করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, অনিয়মের শিকড় অনেক গভীরে।
৪. কেন আজ সাধারণ মানুষকে ভাবতে হবে?
একজন নাগরিক হিসেবে আপনার ভোট দেওয়ার অধিকার তখনই সুরক্ষিত, যখন ভোটার তালিকা নির্ভুল হয়। সরকার যদি আইনি মারপ্যাঁচে বা প্রশাসনিক চাপ দিয়ে ভোটার তালিকায় কারচুপি করার চেষ্টা করে, তবে তা গণতন্ত্রের হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়।
* রাজ্য সরকার কেন অভিজ্ঞ এ-গ্রেড অফিসারদের বদলে নিম্নপদস্থ কর্মীদের কাজে লাগাতে চেয়েছিল?
* কেন বারবার আদালতের নির্দেশ অমান্য করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে?
* কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা নির্বাচন কমিশনের সাথে লড়াই কি জনস্বার্থে, নাকি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে?
উপসংহার
নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং সুপ্রিম কোর্টের এই কঠোর অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রকে অক্সিজেন দিচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে বুঝতে হবে যে, সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নন। যদি একটি রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য উচ্চ আদালতকে প্রতিদিনের কাজে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তবে সেই রাজ্যের ‘গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বন্ধুরা, আজ সময় এসেছে ভাবার। প্রশাসন যখন দলদাস হয়, তখন বিচারালয়ই শেষ ভরসা। বাংলার এই ‘স্পেশাল রিভিশন’ কি আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত? আপনার মতামত নিচে কমেন্টে জানান।









